Skip to main content

*** শ্রীজাত **





ভাঙছে ঠুনকো আড্ডা
সাতটা লাল চা, বিস্কুট
দাম মেটাচ্ছে খুচরো।
অল্প-অল্প বৃষ্টি
একলা হাঁটছি, আস্তে
স্বপ্ন বলতে চাকরি
অস্ত্র বলতে ধান্দা
সত্যিমিথ্যে বন্ধু
পেট গোলাচ্ছে, যাক গে
ফিরতে ফিরতে রাত্তির
ভাত সামান্য ঠান্ডা
খাচ্ছি, গিলছি, ভাবছি
ছোট্টো একটা জানলার
পাল্লা ভিজছে হয়তো,
নীলচে শান্ত পর্দা
একটু-একটু দুলছে,
চুল গড়াচ্ছে বিছনায়,
পাতলা, স্বচ্ছ নাইটি…

--------------------------------------------------------------------------

সহজভাবে পড়তে আসি
দরাজ পাঁচিল, রোদের চিকন
হালকা সেসব শব্দ, তবু
তোমরা বল দেওয়াল লিখন

সহজভাবে দেখতে আসি
টুকরো কাপড়, রঙের মজা
হাওয়ায় কেমন দিব্যি ওড়ে,
তোমরা বল জয়ধ্বজা

সহজভাবে শুনতে আসি
ভালই লাগে আমারও গান
সুরের যত রকমসকম -
তোমরা বল দাবি, স্লোগান

সহজভাবে হাঁটতে আসি
আলগা পায়ে আলতো হোঁচট
পথের ধারে খোলামকুচি
তোমরা বল বিরুদ্ধজোট

এসব যদি সহজ না হয়
সহজ তবে বলব কাকে?
তার চাইতে তোমরা বরং
জটিল করে দাও আমাকে।

-------------------------------------------------------------------------

সারারাত ঝড়ের পরে তোমার কাছে আসা
ভেবেছি শিখিয়ে দেব সকালবেলার ভাষা

সকালের গাছগুলো সব নিথর, জড়োসড়ো
অভিযোগ, বাগ্বিতন্ডা এড়িয়ে চলে ঝড়ও

সে কেবল ঝাপটা লাগায় বাতাসে আর জলে
স্বভাবে দস্যু, তবু নিজের কথাই বলে

আমিও আমার কথা বুঝিয়ে দিতে এসে
দেখেছি চৌকাঠে দাগ, চাউনি একপেশে

কে তোমায় কী বোঝাল, ভুল কিছু, না ঠিকই
আমি তাও আমার কথা আমার মতই লিখি

যতসব জটিল ব্যাপার এড়িয়ে চলে ঝড়ও
আমার এই সহজ লেখা, সহজ ভাবেই পড়ো ।

-------------------------------------------------------------------------------------

শরীর থেকে শরীর ছোটে গন্ধ
আগুন থেকে আগুন অপরাধ
আকাশ থেকে আকাশ ছোটে বিদ্যুত্
পাহাড় থেকে পাহাড় ছোটে খাদ

গুজব থেকে গুজব ছোটে মিথ্যে
প্রহর থেকে প্রহর ছোটে দিন
এঘর থেকে ওঘর ছোটে খেলনা
কাগজ থেকে কাগজ আলপিন

এ হাত থেকে ও হাত ছোটে ওড়না
খবর থেকে খবর অভিঘাত
আড্ডা থেকে আড্ডা ছোটে সন্ধে
ক্লান্তি থেকে কান্তি ছোটে রাত

এতই যদি ক্লান্ত, তবে লাভ কী?
ছুট থামিয়ে বোসো কিছুক্ষণ।
সেই সুযোগে নতুন করে ছুট দিক
আমার থেকে তোমার দিকে, মন।

---------------------------------------------------------------------------

খাবার জলে মিশেছে আর্সেনিক
জলখাবরে মিলতে পারে পাস্তা
শত্রু তোমায় চিনিয়ে দেবে শ্রেণি
বন্ধু তোমায় দেখিয়ে দেবে রাস্তা

এইটুকুই তো। আর বাকি সব বাতিল
বিরাট একটা ইলিউশনে বন্দি
তারই মধ্যে বাহানা বর্ষাতি
সন্ধ্যেবেলা ঠিক করে দেয়, কোন দিক …

আনমনা পথ পেরূ কোনোক্রমে
দু’দিকে যার ছল, অজুহাত, বায়না ….
সব রাস্তা যেতেও পারে রোমে,
সব SMS তোমার কাছে যায় না।

--------------------------------------------------------------------------

তার যেরকম তছনছিয়া স্বভাব
ঝড়ের পিঠে সওয়ার হয়ে আসে,

আমিও তেমন অজ পাড়াগাঁর নবাব
সন্ধেবেলা মুক্তো ছড়াই ঘাসে

তার যেরকম বিরুদ্ধতার মেজাজ
হঠাত্ করে উল্টোদিকে ছোটে

আমিও তেমন আগুনজলে ভেজা
সময় বুঝে ঠোঁট বসাব ঠোঁটে

তার যেরকম উল্টোপাল্টা খুশি
হালকা রঙের বাতাসে চুল বাঁধে

আমিও তেমন সিঁদুরে মেঘ পুষি
কেমন একটা গন্ধ ছড়ায় ছাদে ..

তার যেরকম মন খারাপের বাতিক
সন্ধে হলে ভাল্লাগে না কিছু,

আমিও তেমন জলের ধারে হাঁটি
বুঝতে পারি আকাশ কত নিচু

তার যেরকম জাপটে ধরে সোহাগ
আমায় ছাড়া চলে না একদিনও,

আমিও তেমন দু-চার লাইন দোহা
লেখার ওপর ছড়িয়ে থাকা তৃণ …..

-----------------------------------------------------------------------------------

ভেবেছিলাম শিখব পালক
সফল হলাম অস্ত্রচালনায়

সমস্তদিন ধান্দা পেটের
সময় আমার মাংস কেটে খায়

যুদ্ধে জেতা, যুদ্ধে হারা
এই হিসেবেই কাটল সারারাত

অকাজ আমায় করল কাজী
স্বীকার করি, তোমার বাজি মাত

নির্বাসনে একলা থাকি
তোমায় ভেবে উদাস রাখি দিন

মিটিয়ে নিয়ে ঝগড়াক্ষুধা
তুমি আমায় বললে উদাসীন।

বেশ, তা হলে কাজই করি
জল ঢেলে দিই শুকনো পরিখায় …

ভেবেছিলাম শিখব পালক,
সফল হলাম অস্ত্রচালনায়

-------------------------------------------------------------------------------------

আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে
ছ্যাঁকা যে কেমন লাগে, সবাই জানে।

পুড়ে ঘা তৈরি হবে, তবেই তো সে
জ্বালাবার সাহস পাবে লিখতে বসে …..
তারও খেল পাল্টে যাবে পরের দানে

যে ছিল নিয়মভাঙা পাগলা ঘোড়া
সে হবে সস্তাদামের রাঙতামোড়া
নো বলে এল . বি হঠাত্, উনিশ রানে

তবু তার শিরদাঁড়াকে জল ভেবো না।
তুমি যা চাইছ সে তো হয় না সোনা
সকলেই রাস্তা খোঁজে পরিত্রাণের

অথচ মানুষ মরে দুর্ঘটনায়
মরা লোক অনেকখানি হালকা শোনায়
একথা জেনেও যদি মন না মানে -

আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে
যা খুশি, যখন খুশি ছোঁয়াও প্রাণে -

দেখি, কে সাঁতরে বাঁচে এই তুফানে!

------------------------------------------------------------------------------------

কবি শ্রীজাতর কবিতা

পাকদণ্ডি
কবি শ্রীজাত

পাকদণ্ডি বেয়ে আজ যে উঠছে
মাথা ভর্তি মরা বোলতা ঝিকমিক
গলাভর্তি খিদে তেষ্টা ঝমঝম

পাকদণ্ডি বেয়ে আজ যে উঠছে
ভুলে যাচ্ছে পথ কিন্তু পিচ্ছিল
ভুলে যাচ্ছে হাতে রইল সংযম

পাকদণ্ডি বেয়ে আজ যে উঠছে
নীচে রাস্তা, ভিড়ভাট্টা, খিস্তি
নীচে দুলছে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, ঙয়, টান . . .

পাকদণ্ডি বেয়ে আজ যে উঠছে
তার হাত-পা খসে পড়ছে দাউ দাউ
আর মুণ্ডু কিনে নিচ্ছে শয়তান!



-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------


চন্দ্রকোষ
কবি শ্রীজাত

তীক্ষ্ণ ফলায় গেঁথেছি চাঁদ
খেলা শুরু হলে তোমাকে বাদ
.        (তোমাকে বাদ! তোমাকে বাদ!)

গলিয়ে ফেলেছি পুরনো ঘুম
পথ হারানোর কী মরশুম
.        (কী মরশুম, কী মরশুম)

হারিয়েছি পথ তোর পাড়ায়
ইতিউতি কারা গলা বাড়ায়---
.        (সাহস তো খুব, গলা বাড়ায় ?)

গলা কেটে নাও! কাটা গলায়
ঝ’রে পরে সুর। আর ফলায়
চাঁদ ফেটে নামে চন্দ্রকোষ
.        (তোমার দোষ! তোমার দোষ!)

দোষ কেটে যায়, আহা, নিখাদ---

খেলা শুরু হয়
খেলা শেষ হয়

আমি দিতে থাকি তোমাকে বাদ...
.                তোমাকে বাদ...
.                        তোমাকে বাদ...


----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


ডুবুরিয়া
কবি শ্রীজাত

ঘর থেকে একটু দূরে বিশ্রাম রাখার মতো টিলা
আমাদের দেখা হলো---সে তো শুধু প্রেমের অছিলা

বাবি সে গুছিয়ে বসা। ভাবি সেই ঘাসে ভরা কোল...
না ভাবি আমারই জন্যে প’ড়ে ছিল উপমাসকল

বাচ্চাদের খেলা দেখি। আমাদেরো নানাবিধ খেলা
ফলাফল দাবি করে, আস্তে-আস্তে পড়ে আসে বেলা...

সন্ধে এসে কী রূপ ফোটাবে, তুমি নিজেও জানো না
আমি জানি, আমি খুব মনে মনে মেনেছি যাতনা

মনে মনে আমি শেষ। বাইরে আমি সামান্য প্রবাসী---
খুলে দেওয়া চুল থেকে পৃথিবীর গন্ধ নিতে আসি

না আসি জানিয়ে দিতে। বাঁকে বাঁকে প্রতিবেশী আলো
আমাকে বিষণ্ণ পেয়ে জলে ভরা আঁচল দেখালো

আমার আঁচলে ভয়। জলেও তো ভয় পেয়ে গেছি
অথচ সাহস দ্যাখো---জলের দারেই দাঁড়িয়েছি

বাবছি জল দেখতে দেখতে, আবার লাগাবো কিনা ডুব...
কবে না, তোমার কাছে চ’লে যাবো। ভয় করছে খুব!


-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


আগুনরূপাকে
কবি শ্রীজাত

তুমি টিনেজ নদী, কিছু পাগলপারা
আমি প্রাচীন দেয়াল, ঝুরো পলেস্তারা
তুমি কাচের বিষাদ, মিহি বাতাস ঝালর
আমি বেমক্কা হাত, বাঙি ব্যাথর আলো

তুমি অসম্ভবা। চিরসুপার লোটো।
আমি বাদলদিনে একা দেবব্রত
তুমি সফল পথের ধারে পরাগধানী
আমি সামান্য লোক, দুটো ম্যাজিক জানি

তাতে আধেক জোটে, থাকে আধেক দেনা
এক পাঁকাল হাতে লেখা দাঁড়াচ্ছে না।
তবু লেখাই দাঁড়ায়, ছোটে কী জোর হাওয়া---
জিয়া ধড়ক ধড়ক... যেন ট্রেনের আওয়াজ

আমি নতুন মাতাল। জমে দু’পেগ হেবি।
যদি প্রসাদ না পাই তুমি কিসের দেবী ?
তুমি কীসের মহৎ তুমি কীসের উদার
যদি সাপের কামর খেয়ে মেটাই ক্ষুধা

যদি বিষের পায়েস খেয়ে হজম করি
তবে প্রসাদ পাব ? তবে কভার স্টোরি ?
এসো খেলাও আমায়। আমি সুরের আদল
দেখি সাহস কত, দুটো কথায় বাঁধো---

দ্যাখো বাঁধন ছিঁড়ে ওড়ে লেখার খাতা
মাথা আকাশছোঁয়া, নীচে, হ্যাঁ, কলকাতা
তারও পাড়ায়-পাড়ায় কত পাগল ছেলে
গেল নিরুদ্দেশে... তুমি আরাম পেলে

জানি আমার প্রিয়, তুমি আগুনরূপা
রাতে চিতার মতো জ্বলে তোমার দু’পাশ
জ্বলে দেমার শিখা। তবু সজাগ থেকো
হাতে সময় ঢালাও। তুমি যতই পালাও
.                তুমি যতই জ্বালাও
.                আমি আগুন খেকো।



-----------------------------------------------------------------------------------------------


তার চোখদুটো
কবি শ্রীজাত

তার চোখদুটো ছিল বারতীয়
আর চাউনি কিছুটা মার্কিন
লোকে মরে যাচ্ছিল মার খেয়ে
লোকে মারছিল। তাতে তার কী ?

সে তো জলে খুঁজছিল জীবাণু
যেন দিন কেটে যায় বাতিকে
মুখে সুগন্ধ, আহা, প্রগতির
আর চুলে রং বহুজাতিকের

তার বিছানা তুলোর বন্ধু
তার বিকেলের নাম স্ট্রবেরি
যদি অকারণই এত সুন্দর,
কেন কারণ খুঁজছে সবেরই ?

তার দু’পায়ে মাটির ছন্দ
যদি নাই মেলে তবে কার কী ?
সে তো উঁচু করে নেবে নিচু নাক
য়ার চাইনি কিছুটা মার্কিন...

তবু চোখদুটো ছিল ভারতীয়
শুধু ভারতীয়...
.                আর কিছু না!

------------------------------------------------------------------------------

দ্বিধা
কবি শ্রীজাত

ফেলেছ চোখের জল, রত্ন হয়ে গেছে।
প্রেমিকা বলেচে--- ‘সোনা কাঁদে না অমন’

সেসবও লাগে নি ভাল। ঝগড়া... কাটাকাটি...
প্রতিশোধ নিতে অন্য নারীতে গমন

সেখানেও একই কথা। তফাত বোঝাতে
এ-ক্ষতে এলাচ রাখছ, ও-ক্ষতে চমন

পৃথিবী দু’দিকে। তুমি কোন দিকে যাবে ?
দুয়ারে কলিংবেল, শিয়রে শমন।


----------------------------------------------------------------------------------------------------------



অপেক্ষা
কবি শ্রীজাত

ভ্রু পল্লবে ডাক দিয়েছ, বেশ।
আমার কিন্তু পুরনো অভ্যেস
মিনিট দশেক দেরিতে পৌঁছনো।

তোমার ঘড়ি একটু জোরেই ছোটে
আস্তে করে কামড় দিচ্ছ ঠোঁটে
ঠোঁটের নীচে থমকে আছে ব্রণ।

কুড়ি মিনিট ? বড্ড বাড়াবাড়ি!
দৌড়ে ধরছ ফিরতি পথের গাড়ি
ফিরতি পথেই ভুল হল সময়---  ?

আমারও সব বন্ধুরা গোলমেলে
বুঝিয়ে দেবে তোমায় কাছে পেলে
কেমন করে গল্প শুরু হয়!

খোলাচুলের সজ্ঞা দিতে দিতে
সন্ধে নেমে আসবে বস্তিতে
ভাবছ তোমার অপেক্ষা সার্থক ?

জানবেও না আমি ততক্ষণে
অন্ধকার চন্দনের বনে
ঘুরে মরছি, কলকাতার লোক. . .

---------------------------------------------------------------------------------------------------------- 



বসন্তের চিঠি
কবি শ্রীজাত

বসন্ত এসেছে। আমার শহর ভীষণ একলা এখন
দূর থেকে আজ কে বুঝবে তার চোখের কোণে জল না ধুলো
হাওয়ায় উড়ছে শুকনো পাতা, পায়ের ছাপও থাকছে না আর
আস্তে-আস্তে ঝাপসা হচ্ছে ভালোবাসার রাস্তাগুলো

তবুও কথা জমছে। কথার নাম জানি না, মানে বুঝি না
টেলিগ্রাফের তারের উপর শালিক বসেছে জোড়ায় জোড়ায়
দুপুর রোদ্দুরে মুখে মুখোশ এঁটে ঘুরে বেড়াই
রাতে বুকের মধ্যে কারা দাঙ্গা করে, টায়ার পোড়ায়. . .

সেই সঙ্গে ঘুম আসে আর ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন ঢোকে
স্বপ্নে আমি মাথা ঝাঁকাই স্বভাবসুলভ অবাধ্যতায়
হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের মুখের আদল ভাসে তখন
ছুটতে ছুটতে হাঁপিয়ে পড়ি, মন খারাপের সময় কোথায়

অথচ এই খারাপ মনে বেঁচে থাকার ইচ্ছে দারুণ
কে জানে এই চিঠি লিখছি কীসের টানে, কোন গরজে
বয়স যেন পাহাড়ি পথ, কাদের নীচে পড়ার সময়
পলকা আমার শরীর শুধু শরীর, তুমুল শরীর খোঁজে

ওই ঠোঁটে ঠোঁট রাখবো ভাবি। লাগবে কি এক শতাব্দীকাল ?
তোর কপালে সিঁদুরে মেঘ, আমার হাতে কাপাস তুলো
শিগগিরি আয়। এই বসন্তে আমার শহর একলা ভীষণ
আস্তে আস্তে ঝাপসা হচ্ছে ভালোবাসার রাস্তাগুলো

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------




বৈশাখ
কবি শ্রীজাত

গেল চৈত্র, গেল সেল, পকেট ফুরালো
বত্সর নতুন কিন্তু নিভু নিভু আলো

অথচ বৈশাখ, দ্যাখো, এসে গেছে আজ
তাওয়ায় গড়াচ্ছে তেল, চনমনে পেঁয়াজ

মেশাও তো দেখি যাদু, মশলায়-চিকেনে
যা চোখ, নজর রাখো, কে কেনে কী কেনে

ভাঙা চশমা, আলমারি, রূপোর দোয়াত
ঝোপ বুঝে কোপ মারো। মেপে কাটো হাত।

কাটা হাত নিয়ে ফের বিক্রি আয়োজন
দড়িপাল্লা... বাটখারা... তিল-তিল ওজন...

বিক্রি তো প্রাচীন যন্ত্র, জাদু দেখাবার
দশটা পেটে লাথি পড়লে একটায় খাবার

যা চোখ, মাথার মধ্যে উপায় লিখে নে---
কাটা হাত মিশিয়ে দে মশলায়-চিকেনে!

-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


মাঘ
কবি শ্রীজাত

ময়দান-ময়দান খেলা। ধুলোর সাগর।
কত ইচ্ছাজাগরণ, যত ইচ্ছা ঘোর---

তোমার পুস্তকমেলা, আশমান কিতাবি
বইয়ের দেরাজ খেলা, হারিয়েছি চাবি

‘অমুকে হারিয়েছেন . . .’ গমগম ঘোষণা
আমিও হারিয়ে গেছি। খুঁজে দ্যাখো সোনা,

এ-দরজায়, সে-হাউসে, এ-স্টলে, ও-বাঁকে
কতবার বই ভেবে দেখেছি তোমাকে

অথচ মলাট পালটে পেপারব্যাকে সেজে
পুনরায় উচ্ছেদের নোটিস এসেছে।

উঠে যাব। উঠে যাব। উঠে-উঠে যাব।
যেখানে দেখিব ছাই দু’চোখ ভেজাব।

এ মাটি ছাড়লাম তবে, আমাতে তোমাতে
অন্য বইয়ে দেখা হবে, অন্য কোনও মাঠে . . .

         ******************** 




ফাগুন
কবি শ্রীজাত

এসেছে বসন্তরাজা এই কলকাতায়
আগে পিছে সে কত না লোকজন পাঠায়

বাঁকে বাঁকে ফুটে ওঠে কৃষ্ণচূড়ামণি
বসন্ত কী চীজ, তুমি জান না মামনি

তাহারে ছাড়ায় প্রেম, সাধ্য আছে কার
শাখে-শাখে মাথা কুটছে ডবল ডেকার

বসেছ জানলার সিটে, কোলে পড়ল পাতা
তখন উদাস তুমি। খুলেছ খোঁপাটা . . .

পাতাটা খোলোনি। সে তো চিঠি। টেলিগ্রাম।
বসন্তে না থাকতে পেরে তোমাকে লিখলাম।

একখানা পাগল আজও হাওয়াগন্ধ মাখে
কয়েকদিন দূর থেকে দেখেছে তোমাকে

এবার সিদ্ধান্ত করো--- ভাব অথবা আড়ি
বিশ্বাসে মিলায় ছবি। সান্যালে পাহাড়ি।

.            ******************** 





রাতে যেসব স্বপ্ন আসে
কবি শ্রীজাত

শরীর, শুধু শরীর থেকে গড়ায়
তোমার দিকে আঠালো সম্প্রীতি
সেটাই তফাত জ্যান্ত আর মড়ায়
হুক আর বোতাম খুলছে মেগাসিটি

ফ্লাইওভারে বাঁক খেয়েছে কোমর
হাঁটলে দোলে ইত্তেজনার পারা
সেটাই তফাত হেটেরো আর হোমোর
ভোল্যাপচুয়াস দিগন্তে নীল তারা

দেখতে দেখতে গভীর হল ক্লিভেজ
আজ দু’হাতে দু’দিক চেপে ধরি
ঘাস সরিয়ে জড়িয়ে নিই জিভে
এই শহরের তুলতুলে ক্লিটোরিস

জায়গা মতো ঢাকনা খোলা পেলে
উওম্যান-হোলে ঢুকিয়ে দেব মাথা
একবিছানা ছটফাটানো ছেলে . . .
আমার সঙ্গে সোবে না, কলকাতা ?

.         ******************** 





যাকে নিয়ে পালাতে চেয়েছিলাম
কবি শ্রীজাত

ভাত কাপড় জোটাতে হবে। তাই তো
ফেরার পথে বিক্রি করি আত্মা
যারা সেদিন বন্ধু হতে চাইত,
তাদেরও আজ স্বভাবদোষ। হাতটান।

নতুন মেঘে স্বীকার করি বৃষ্টি।
জলের গায়ে ভাসিয়ে দিই দূরবিন
সময় বলে--- ‘এটাই শেষ কিস্তি।
বাকি জীবন পাগল হয়ে ঘুরবি।’

ঘুরেছি। আর গোপন সব চিহ্নে
খুঁজেছি মরা জাদুকরের পসরা
বুঝেছি তাকে পাবার কোনো সিন নেই
ওষুধ খেয়ে ঘুম হয় নি দশ রাত।

ঘুমের নীচে নানারকম টুথপিক
তাতে আমার দু’চোখ যায় ঠিকরে
সময় বলে--- ‘বাকি জীবন ছুটবি।
বুকের কাছে পাথর হবে সিক্রেট।’

হয়েছে। তাই বিক্রি হওয়া সার্থক।
ভাঙা মুঠোয় আংকড়ে ধরি নীল দাঁত
আমায় শুধু বাঁচিয়ে দিতে পারত
মেয়েটি, যার নাম ছিল মাতিলদা . . .

.         ******************** 





চিলেকোঠার ঘুম
কবি শ্রীজাত

সর্বনাশের মাথায় বাড়ি
বাড়ির মাথায় ছাদ

একটা মাদুর, তিনটে বালিশ
আটখানা আহ্লাদ

খোশমেজাজের গন্ধ ঘেরা
চিলেকোঠার ঘুম

পাঁচিল খসায় পলেস্তারা
পাখিরা নিঃঝুম

আঁচল থেকে নকশা নামে
উনুন থেকে আঁচ

মুঠোর ভেতর খচরমচর
বন্ধু ভাঙা কাচ

তিনটে বালিশ, একটা মাদুর
দোহারা পিলসুজ

আকাশ থেকে আলো পাঠায়
রূপোলি তরমুজ

নোনতা রঙের জোছনা লেগে
শরীররে হৈ চৈ

মিনিট জমে রাত বানাল
আড্ডা জমে দই

চামচ দিয়ে আলতো ক’রে
তিনটে সমান ভাগ

ঝাপতালে তার শব্দ থাকে।
কামড়ালে তার দাগ।

চিলেকোঠার ঘুম ভাঙে না
কীসব খেলা হয়

তিনজোড়া হাত খিদের ছকে
চেলেছে সংশয়

বাকিটা ভুল, বাকিটা ঝড়
বাকিটা নিশ্বাস

ক্লান্ত, সুখী, তপ্ত, নরম,
অল্প ভেজা ঘাস

এরপরে যেই সকাল হবে
কাজ পোহাবে লোক

রোদের টোকায় ঘুম ছাড়াবে
চিলেকোঠার চোখ

দেখতে পাবে চৌকাঠে তার
নতুন রকম স্বাদ

জল খাবারে গরম বালিশ
মাদুর পাতা ছাদ . . .

.       ******************** 






তোমাকে শেষ চিঠি
কবি শ্রীজাত

ঘুমে ঝগড়ায় ঘুমে ঝগড়ায় ঘুমে
ছেড়ে তো এলাম বরফের মরশুমে

এখনো তোমার ওভারকোটের কাছে
আদরের মতো কী একটা লেগে আছে . . .

ও নিয়ে ভেবো না। উইকেণ্ড-এর রাতে
আমাকে যদি বা না-ও মনে পড়ে, তাতে

বিস্ময় নেই। হাইওয়ে আছে শুধু
ছেড়ে আসা যত, তার চে’ওবেশী ধূ-ধূ . . .

মাঝে টিম টিম দেকোনপাটের বাকি
ছেড়ে তো এলাম বয়েসের বরসাতি

এখনো ওখানে সামান্য বিনিময়ে
দু’জনের ঠোঁট রাখা যায়, একই স্ট্র-এ ?

একা যদি যাও ড্রাইভে, কিনো
হাইওয়ে থেকে, মাঝরাতে, ক্যাপুচিনো

.          ******************** 






আষাঢ়
কবি শ্রীজাত

ভেসে গেল আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে---
ক্যাপচার করেছ মম হৃদয় কী বসে

নাওয়া নাই খাওয়া নাই হাওয়া নাই কোনও
কেবল জলের তোড়ে দাওয়াটি নিকোনো।

বৃষ্টি আসে ঝেঁপে, আমি কান্না চেপে আছি
ঠাণ্ডা বুকে ঠেসে ধরছি গরম পেঁয়াজি

কেহ বলে পথ্য খাও, দেখাও ডাক্তার
কেহ বলে শুনে দ্যাখো বেগম আখতার---

কেহ বলে ও কিছু না। বর্ষার বিলাস
টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে। কী জ্যান্ত, কী লাশ।

গুটিয়ে নিয়েছি প্যান্ট, হাঁটু অব্দি জল
জোয়ারের স্রোতে একা ছিপছিপে হিজল

ডুবেছে প্রথম দিনে। বোঝে বা ক’জনই
কী ভাবে সাঁতরাই বলো, সহস্র রজনী

.          ******************** 





শ্রাবণ
কবি শ্রীজাত

সে ছিল আমারই দেশ, মেঘের পুজারি
এখন সন্ত্রাস চলে। দ্যাখো, কার্ফু জারি---

১৪৪ ধারা। যে বেরোবে, লাশ।
ভরেছে শ্রাবণ ? তব জলের গেলাস ?

সমুদ্রের তীরে বসে কাঁঠেলে ছোঁয়াচ
দেশ কাল ডুবিয়ে, আহা, ঘুম যাচ্চো আজ . . .

ডাকতে গেছি, বলে দিলে--- ‘রেস্ট নিচ্ছি। যা তো!’
তোমার ধুমের নীচে ক’লক্ষ শ্রীজাত

ডুবে মরতে-মরতে যাবে, ঝরতে-ঝরতে যাবে . . .
তার আগে তোমার স্বপ্ন ঝলসাক তেজ়াবে

কে আছো ? জাগাও ওকে। চড় মেরে ওঠাও---
মুখ ধুলে কুলকুচিতে ডুবে মরব, তাও

পরাবো কংক্রিট-স্মৃতি, নিজ হাতে বোনা
ভুলবে শ্রীজাতদের ? সুজোগ দেব না!

.           ******************** 






কার্তিক
কবি শ্রীজাত

সামনে বি.এ. ফাইনাল। বইয়ে মন দিয়ো।
যা কিছু উদাস, ফালতু, জীবনানন্দীয়,

যে বাংলা মদের রাজা, যে বাংলা রূপসী
তার সামনে নত হই। আলুথালু বসি।

কোথাও যাব না। সেই এক গোঁয়ার্তুমি।
আমাকে জ্বালায় রাগ। ঝগড়া। আর তুমি ?

তোমাকে মানায় শুধু কোচিংয়ে-কলেজে
‘হৃদিপথে এসো প্রিয়া’---এ কথা বলে যে,

তারে অন্ধ করে দাও। ভিক্ষায় বসাও।
একবেলায় ঘুচে যাক প্রেমিক দশাও

হাওয়ায় হিমের ঠাণ্ডা, স্পর্শ রেখ চিনে
তোমাকে মানিয়ে যাক কলেজে-কোচিংয়ে

ঝরুক হলুদ পাতা... হেঁটো না ও পথে
হেমন্ত ঋতুর শ্রেষ্ঠ। মুখার্জিরও বটে।

.           ******************** 






ডিপ্রেশন
কবি শ্রীজাত

ডিপ্রেশনের বাংলা নাকি নিম্নচাপ ?
বৃষ্টি এল। সঙ্গে কফি এক-দু’কাপ

নামছে বিকেল, অল্প ভিজে রাস্তাঘাট
ছাতার নীচে মিইয়ে গেল পাপড়ি চাট

বন্ধুরা সব ফিরছে বাড়ি দূর থেকে . . .
কেন যে আজ হিংসে হল তাই দেখে,
দেখতে গিয়ে সন্ধে হল জানলাতেই
আগের মতো মেঘ করেছে . . . কান্না নেই

কেবল মুঠোয় বন্দী কফির একলা কাপ
ডিপ্রেশনের বাংলা জানি। মনখারাপ।

.           ******************** 







সমাপতন
শ্রীজাত
( সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম আন্দোলন চলাকালীন এই কবিতাটি 'পর্বান্তর' পত্রিকার মে - আগস্ট ২০০৭ এর সংখ্যায় প্রকাশিত
হয়েছিল | )

সমাপতন এমনই হওয়া উচিত
আমার মাথা তোমার বন্দুক |
কর্ম থেকে আলাদা হল সূচি
মুখোশ থেকে বেরিয়ে এল মুখ |

তোমার নাকি রাস্তাই ছিল না
মানুষ কেটে ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া ?
আমার কাজ মৃত্যু হাতে গোনা
মপলে তবে শান্ত হয় পাড়া |

দেখালে তুমি কি ভাবে নিতে হয় |
গণতন্ত্রে এমনই হওয়া উচিত |
পাতাল থেকে উথলে উঠে ভয়
পোশাক খুলে দাঁত দেখায় রুচি |

আমরা সেই রুচি খাই-পড়ি
আমরা সেই রুচির গান গাই
মুখে যখন বলেছি "মরি মরি"
বুকে তখন বুলেট বেঁধা চাই |

বিঁধেছে | তারই রক্ত লাগে হাতে |
বাকি জীবন তোয়ালে দিয়ে মুছি ?
তুমি তখন ছিলে না সাক্ষাতে
সমাপতন এমনই হওয়া উচিত |

.           ******************** 





উদ্ধার
কবি শ্রীজাত

ভাঙা জাহাজের পাশে বসে আছি
আধো চুপ, আধো আনমনা

ঘুন ধরে গেচে ডেক-পাটাতনে
ঘুম ধরে গেছে কম্পাসে

সুযোগের মতো একের পর এক
ঝরে গেছে ফুল শাল্মলী

ফসফরাসের দাগ ধরে ধরে
এসেছিল যারা আন্দাজে,

ফিরে চলে গেছে, চিরে চলে গেছে
সমুদ্র আর সন্দেহ

পড়ে আছে ধূ-ধূ ভেজা বালি আর
উঠে আসা দল, কচ্ছপের . . .

হাত-পা গুটিয়ে বসে আছি তবু
চুপ করে আর আনমনে

সকালের আগে আসবে না আজ ?
.                        হেলিকপ্টারে ?
.                                বন্ধুরা ?

.           ******************** 





সারারাত বেড়াল কাঁদে
কবি শ্রীজাত

সারারাত বেড়াল কাঁদে
আমাদের পাশের বাড়ি।
মা ভাবে ভাগ্যে আছে
শুভ একটা কিছু
বাবা খুব বিরক্ত হয়
আমারও ঘুম আসে না।
আসলে বেড়ালটারই
অশুভ হবার কথা।
হয় তার বাচ্চা হারায়
নয় সে খিদের মুখে
লাথি খায় গেরস্থালির
আসলে বেড়ালটারই
অশুভ কাটছে ভীষণ।
কিন্তু সে জানে না,
তার এই নীল গোঙানি
অশুভর প্রতীক হয়ে
আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়
আমারও ঘুম আসে না
বাবা খুব বিরক্ত হয়
মা ভাবে ভাগ্যে আছে
অশুভ একটা কিছু...
সারারাত বেড়াল কাঁদে
আমাদের মাথার ভেতর।

.      ******************** 







এমনি বই
কবি শ্রীজাত

এই আমার এমনি বই ফোর কালার দুই মলাট
এই আমার এমনি এক ফালতু বই বিচ্ছিরি
কিন্তু তাও তার ভেতর চোখ ফেলিস সাবধানে
অক্ষরের এক-দু’ পিস একটু হাত ফসকালেই
জঙ্গলের অন্ধকার। ঘাসপাথর। রাস্তা নেই।
আবছা দোল, লণ্ঠনের। আশ্রয়ের কাঠবাড়ি।
দরজা লক। টান দিলেই এক শহর জমজমাট
জ্যান্ত ভিড়, জোরবাজার, দরদামের হল্লা বোল
দিলদরাজ হাড়কেপন খোশমেজাজ এক শহর
ফুটকড়াই, কাচফোড়ন, বচ্চনের অগ্নিপথ
দিনদুপুর জোরগলায় তিন-কা-দশ ব্যালকনি
চোর পুলিস, ঝাঁকবুলেট, কম বয়েস প্রেম পালায়
বৃষ্টি জোর, এফ. বি. আই. কপ্টারের তল্লাসি
হাতসাফাই, খুনজখম, এক মিনিচ শোকপালন
ঈর্ষাফুল কামড়ে খায় আস্তিনের বাস্তু সাপ . . .
এইসবের বেশ দূরেই তৈরি হয় এক বাতাস
ঘোর লাগায়... ঘুর্ণিঘোর... ডাক পাঠায়... ঝঞ্ঝাডাক...
সেই হাওয়ার পাগলা ঝড় তুলকামাল করছে সব
খড়কুটোর এক ঠেলায় উড়ছে সব ঘরবাড়ি
উড়ছে তাস, তুবড়ি আর রং বেরং গ্যাসবেলুন
দশরকম প্লাস্টিকের সূর্য আর চাঁদতারা
শ্যাম্পেন আর ছাঁটকাগজ... এই বিশাল কার্নিভাল
আজ তোদের জন্যে, আয়, বচ্চালোগ হাততালি!
এই আমার যত্তসব যাচ্ছেতাই ধুত্তেরি
ম্যানড্রেকের ডাইরি শেষ। ভাবছি আর লিখব না।
রইল এই দুই মলাট, আশ্রয়ের কাঠবাড়ি
এই আমার এমনি বই, যার ভেতর বন্দী আজ
.                                নীল গ্রহের শেষ ম্যাজিক...

.                 ******************** 






ছুট
কবি শ্রীজাত

শরীর থেকে শরীর ছোটে গন্ধ
আগুন থেকে আগুন অপরাধ
আকাশ থেকে আকাশ ছোটে বিদ্যুৎ
পাহাড় থেকে পাহাড় ছোটে খাদ

গুজব থেকে গুজব ছোটে মিথ্যে
প্রহর থেকে প্রহর ছোটে দিন
এ ঘর থেকে ও ঘর ছোটে খেলনা
কাগজ থেকে কাগজ আলপিন

এ হাত থেকে ও হাত ছোটে ওড়না
খবর থেকে খবর অভিঘাত
আড্ডা থেকে আড্ডা ছোটে সন্ধে
ক্লান্তি থেকে ক্লান্তি ছোটে রাত

এতই যদি ক্লান্ত তবে লাভ কী ?
ছুট থামিয়ে বোসো কিছুক্ষণ।
সেই সুযোগে নতুন করে ছুট দিক
আমার থেকে তোমার দিকে মন।

.         ******************** 






সুমন একক
কবি শ্রীজাত

তোকে আদর করার ইচ্ছে আমার অনেক দিনের।
গরম হাতের পাতায় ঠাণ্ডা চুমু(ক) দিয়েই শুনি
সুমন গিটার নিয়ে গান ধরেছেন লোডশেডিং-এর
হৃদয় অন্ধকারে কাঁপছে, যেমন নতুন খুনি!

তাজা ফলের মতো সময় কবে যায় আমাদের ?
পোকা বাছতে গিয়ে অঙ্গে ওঠে আংটি-তাবিজ
তোকে দেখছি পাশে। হয়ত কয়েক বছর বাদে
অনেক দূরের দুটো স্টেশন হবো... তবুও ভাবি

কবে ঠোঁটের উপর ঠোঁট বসাব, ঠিক যেরকম
একলা ট্রেনের মুখে ইঞ্জিন সশব্দে লাগে...
কবে জিভ দিয়ে তুই চাটবি আমার টাকটা জখম
প্রতি পূর্ণিমাতে জন্ম নেব নেকড়ে বাঘের

যেমন সুমন বোঝেন একপিয়ানো উদ্দামতা,
আমার শরীর থেকে পারলে একটু অশান্তি নে---
আমি ডরাই না তোর আনমনা মুখ, মিথ্যে কথা
তোকে আদর করার ইচ্ছে আমার অনেকদিনের...

.              ******************** 







সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী একটি কবিতা
কবি শ্রীজাত

ধ্বংস বললে কম বলা হবে হয়তো
শেষ বললেও বোঝানো যাবে না কিছু
ভাবার আগেই লাশ হয়ে গেছে, নয়তো
তলায় তলায় সবাই বাঁচতে ইচ্ছুক

ওপরে ওপরে ছিঁড়েখুঁড়ে গেছে সাম্য
হাঁ করলে মুখে ঢুকিয়ে দিচ্ছে বন্দুক
পৈতে ছেড়েও থেকে গেছি চেনা ব্রাহ্মণ
আমারও রয়েছে মুসলিম কিছু বন্ধু

রাতের নিউজে, ভোরের খবর কাগজে
ঘুমচোখে রোজ সবাই দেখেছি মৃত্যু
লুকিয়ে কাঁদছি যাতে প্রতিবেশী না বোঝে
সকলের মতো আমিও আসলে মিথ্যুক

চোখ বুজে, মাথা নিচু ক’রে থাকি। সামনে
শরীরে আগুন লাগানো মানুষ জল চায়...
দু’দিন পরেই ট্যুরিজম ভ্যালু নামলে
গুজরাতটাও ঘোরা যাবে কম খরচায়

তখন হয়তো দাঙ্গা অন্য রাজ্যে
লোক পোড়াচ্ছে, ঘর জ্বালাচ্ছে চুপচাপ...
যাদের পুড়লো, তারা পথে বসে কাঁদছে
যাদের পোড়েনি, তাদেরই কিন্তু খুব চাপ---

কিছু ম্যাগাজিন স্টোরি পেয়ে গেল মুফতে
থিম পেয়ে গেল যারা ছবি আঁকে, গান গায়
ভিড়ের মধ্যে নিজের যায়গা খুঁজতে
আমিও যেমন কবিতা লিখেছি দাঙ্গায়...

.            ******************** 





তারপর মুন্নাভাই সার্কিটকে বললেন :
কবি শ্রীজাত

ঝাপটিয়ে পালাল পাখি
আজ নগদ, কাল বাকি
আত্মাটি হল বিদেহী দুনিয়ায়

কষ্টকে প্যাকেটে পুরে
ডিসপ্যাচ করে দে দূরে
মিষ্টি হেসে গালাগালি শুনি আয়

তেষ্টায় জোটেনি জলও
পাত্র আজ টলোমলো
অমৃত না বিষ---খালি জেনে খা

ফুর্তিতে দু’চোখ বেঁধে
মস্তি ক’রে কাটিয়ে দে
টেনশন লেনে কা নেহি। দেনে কা।

.         ******************** 







পদ্যসমগ্র
কবি শ্রীজাত

বাতাসকে দিই হাল্কা ধমক রোজ
আলতো টোকায় ছাই ঝাড়ি সূর্যের
আকাশ যখন পদ্যসমগ্র---
আমরা সবাই শক্তি চাটুজ্যে!

.       ******************** 






রাঁধুনি
কবি শ্রীজাত

বান্ধবী, তোর বয়স আমার মনমতো নয়
কেননা তোর জানলা খুললে কদম্বগাছ
সারাটা দিন হেলতে-দুলতে বার্তা পাঠায়---
বার্তা যখন চায়ের চিনি, ডালের ফোড়ন,
বার্তা তখন হাজার চোখের ফাই-ফরমাশ
শেষ অব্দি তাও হারিয়ে যায় ধোঁয়ায়, তলে...
লোকাল ট্রেনের বাঁশি ছড়ায় পুরনো দিন---
লিখিস তখন ? কী বলতে চাস ? কোথায় কোথায়
কোত্থাও নয়। কেবল যেদিন পূর্ণিমা হয়,

রান্নাঘরের মেঝেয় জোটে বরাদ্দ চাঁদ,
সেদিন রাতে আমিও থাকি ;
সেই জোছনায় ডুবন্ত দুই ঝলসানো হাত
পূর্ণ করিস! ভাবনা কিসের ? বান্ধবী, তোর
সঙ্গে আছেন, দু’এক কলি রবীন্দ্রনাথ॥

.           ******************** 








কিছু প্রেম কিছু বিচ্ছেদ
কবি শ্রীজাত

ভেঙেছি কঠিন কাব্য
কেটেছে দু’এক ইঞ্চি
ঝলমলাচ্ছে কাপবোর্ড
সস্তায় হলে কিনছি

অথচ এথনো ঘর নেই
বয়েস মাত্র উনত্রিশ
জুটেছে বধির কর্ণে
হেডফোন আর কুন্তী

মাঝামাঝি কোনও সিন নেই।
জিন্দা অথবা মুর্দা,
দুপুরেও দেখে চিনলে,
সন্ধে হলেই সুরদাস।

চুমু এঁটো। তবু খুব খায়
ওর স্বামী আর এর স্ত্রী
মাঝে মাঝে দোসা, থুকপা
অথবা নরম পেস্ট্রি।

পচা সুখ মরা হিংসে
বয়ে নিয়ে চলে গঙ্গা
ভোকাল বলতে ভীমসেন
লোকাল বলতে বনগাঁ।

তারও পরে আছে কাব্য
সেখানে খাটে না টেকনিক
ভাবি তার পিঠে চাপব,
কোত্থেকে এসে পেত্নি।

কে জানে কীসের ধান্দায়
আমাকে গিলিয়ে দিচ্ছে
ঝিনুকে গরম-ঠান্ডা,
কিছু প্রেম, কিছু বিচ্ছেদ!

.     ******************** 



Comments

Popular posts from this blog

**কষ্টকে ভালোবেসে আমি কবি হবো**

আমাদের দুজনার পৃথিবী দুটো শুরু থেকে আলাদা, তোর পুতুল খেলার সংসার, রংচঙে সাজানো গোছানো, তোর চুলের ক্লিপ, ধোয়া তোয়ালে,পোশাক রং মেলানো, আমিও সেই জগতের পভোলা এক পথিক শুধু, কখনও ভ্রমর হয়ে ফুলের থেকে চুরি করে একটু মধু, বাদবাকি খোঁচা-খোঁচা দাড়ি-গোঁফে,আমি কালো সাদা, আমাদের দুজনার পৃথিবী দুটো শুরু থেকেই আলাদা । আমার ভালো লাগে মেঘলা আকাশ, এক-পশলা ইলশেগুঁড়ি, রাতজাগা পাখির ডাক আর পুর্নিমাতে চাঁদেরবুড়ি, সেই জগতে কোনোখানেও ভুল করেও আসবিনা তুই, অথচ সবের পরেও দুইজনেতে একই খাটেই শুই, একই ঘরে দুজনার দুই পৃথিবী বাঁচবে আধা-আধা, আমাদের দুজনার পৃথিবী দুটো শুরু থেকেই আলাদা । তোর সাথে রং মিলিয়ে আমি, চাইলে হয়ত পাল্টাতেও পারি, তোকেও হয়ত ভুল বুজিয়ে, আমার জগতে ডেকে নিতে পারি, কিন্তু সেতো নিছক জীবনের সাথে সমঝোতাই হবে, দুই পৃথিবীর দুটো জীবন তখন কি আর জীবন-খুঁজে পাবে ? ----------------------------------------------------------------------------- সমুদ্র হোক বা পাহাড়, নদী হোক বা পর্বত, দৃষ্টির আরাম-খুজতে আমরা সবাই ছুটে যেতে চাই । আর,শুধু কি চোখের আরাম ? সাথে কাজের বিরাম, মুখের আরাম,সঙ্গে পেটে একটু রঙিন জল পড়লে, প...

***ভালোবাসা পুঁজি করে নেমে পড় জীবনযুদ্ধে ***

একটা ব্যাকডেটেড মেয়ে খুজে নাও । যে ভালোবাসি বলার আগে তিনবার হোচট খাবে । মাঝে মাঝে হাল্কা শাসনে যে মনে করিয়ে দিবে জীবনের কথা । এত্তোগুলা ভালোবাসা পুঁজি করে নেমে পড় জীবনযুদ্ধে । বাসের ভিড়েপরম যত্নে শরীর দিয়ে আড়াল কর তার খোপার উদ্দেশ্যে কিনে নেয়া রক্তগোলাপটাকে। একটা ভালো ছবি তুলে বেড়ে যাক তোমাদের ভালোবাসা । শীতার্ত সন্ধ্যায় চায়ের কাপ টুকু ভাগাভাগি করে বুঝে নাও তোমাদের ভাল থাকার অধিকার। কপালে নেমে আসা ওর দুএকটা চুলে আঙ্গুল বোলাও অবুঝ আহ্লাদে । কোন এক শীতার্ত দুপুরে কোনও পার্কে ডুব দাও তার ঠোঁটের আটলান্টিকে। শুধু একটা ব্যাকডেটেড মেয়ে খুজে নাও ... ভালোবাসার থার্মোমিটার ফাটিয়ে দাও!!! ---------------------------------------------------------------------- আমার শব্দ চয়নে আভিজাত্য নেই; প্রতিদিনকার চাল,ডাল, লবণ পিয়াজের মতো নিত্যনৈমিত্তিক খাবারে মতো সাধারণ শব্দে আমার কাব্য যেমন সাধারণ আমার পরিধেয়। তোমাকে ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় বিলাসিতা! যদি আমাকে ভালবেসে পাশে থাকো তবে আমি চিরকাল সাধারণই থাকবো যা আমার আমিত্বের প্রকাশ। আমি সব হারাতে প্রস্তুত; কিন্তু আমার...