Skip to main content

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাদম্বরী ------ ঘটনার অন্তরালে ৩

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাদম্বরী ------ ঘটনার অন্তরালে

মানুষের সাথে মানুষের অনেক ধরনের সম্পর্ক থাকে। নর ও নারীর সম্পর্ক ও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়। একটা সময় হয়তো ছিল নর - নারীর মধ্যে সামাজিক লেখা পড়ার বাইরে অন্য কোন ধরনের সম্পর্কের কথা ভাবাই যেতো না। সভ্যতার সাথে যুগে যুগে মানুষ তার সম্পর্কগুলোকে আলাদা নাম দিতে ও ব্যাখা করতে শিখেছে। তারপরও একটা কথা থেকেই যায়। সব সম্পর্ককেই কি সব সময় ভাষায় ব্যাখা করা যায়? নাকি সব ভালোলাগাকেই চিরাচরিত নাম ভালোবাসা বা প্রেমের আবরনে মুড়িয়ে দেয়া যায়? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আলোচনা হলে অনেক সময়ই অনেকে তার বৌদি কাদম্বরী দেবীকে তার সাথে জড়িয়ে এক ধরনের রসাত্মক আলোচনা করতে পছন্দ করেন। তাদের মধ্যে একটা অন্য ধরনের সম্পর্কের ইঙ্গিতও দেন। আসলেই কি সেই ধরনের কিছু আদৌতেও তাদের মধ্যে ছিল? ভালোলাগা মানেই কি কোন ধরনের আলাদা বা নিষিদ্ধ সম্পর্ক?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের পরিবার একেতো ব্রাক্ষ ছিলেন তারমধ্যে আবার পিরালী। তাদের সাথে বিয়ের সম্পর্ক করতে সামাজিকভাবে অনেকেই সাহস পেতেন না। সেজন্য বাংলাদেশের যশোরের দিকে, যেখানে ঠাকুর পরিবারের জমিদারী ছিল, তার আশে পাশের গ্রামের সাধারন ঘরের মেয়েদের দেখে বউ বানিয়ে আনা হতো। কিন্তু কাদম্বরী যশোরের সেরকম রায় বংশের মেয়ে ছিলেন না। তিনি ছিলেন কোলকাতার মেয়ে। যদিও তাদের আগে থেকেই ঠাকুর বাড়ির সাথে বিয়ের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। শুধু জোড়াসাকোর ঠাকুরবাড়ি নয়, পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর বাড়ির সাথেও তাদের আত্মীয়তা ছিল বিয়ের সূত্র ধরে। তারপরও কাদম্বরীর সাথে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এর বিয়েতে জ্যোতি এর দাদা সত্যেন্দ্রনাথ কিছুতেই রাজী ছিলেন না। কাদম্বরীর দাদা একসময় কাদম্বরীর বাবা ও কাকাকে নিয়ে তাদের বাড়িতে আশ্রিত ছিলেন। কাদম্বরীর দাদা তাদের বাড়ীর সন্দেশ খেয়ে বলে দিতেন কোনটি বাসি আর কোনটি নয়, সে সন্দেশ পরীক্ষকের নাতনী হবে তার আদরের ভাই জ্যোতির বউ? জ্যোতি তখন বিলেত যাবেন পড়তে। ফিরে এসে এই ছোট্ট খুকীর সাথে মানিয়ে নিতে পারবেনতো? শেষে না দুটি জীবন নষ্ট হয়ে যায় এই ভাবনায় তিনি কাতর ছিলেন। কিন্তু এতদসত্বেও তিনি কিছুতেই গুরুজনদের মত পরিবর্তন করতে পারলেন না।

আট বছরের খুকী মাতঙ্গিনীর সাথে জ্যোতির বিয়ে হয়ে গেলো। ঠাকুরবাড়ীতে বহু বউদেরই আগের নাম বদলে দেয়া হতো। মাতঙ্গিনী হারিয়ে গেলেন কাদম্বরীর মধ্যে। যখন কাদম্বরী বউ হয়ে ঠাকুর বাড়িতে প্রবেশ করেন, ঠাকুরবাড়ীর সে বছরের হিসেবের খাতায় লেখা আছে তার জন্য সে বছর বর্ণ পরিচয়ের প্রথম ও দ্বিতীয়ভাগ কেনা হয়েছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে কিছুটা গোড়া থাকলেও পরে দাদা সত্যেন্দ্র ও বৌদি জ্ঞানদানন্দিনীর প্রভাবে সাবেক সংস্কার ত্যাগ করে কাদম্বরীকে ঘোড়ায় চড়া ও শিখিয়ে ছিলেন। গঙ্গার ধারে নির্জন শিক্ষা শেষ হলে প্রতিদিন তারা দুজন গড়ের মাঠে ঘোড়ায় চড়ে হাওয়া খেতে বের হতেন। সেই সময় কাদম্বরীর অশ্বারোহন রীতিমতো আলোড়ন জাগিয়ে ছিল কোলকাতার সমাজে। সাধারন নারীদের চোখে তিনি একে দিয়েছিলেন দুঃসাহসের মায়াঞ্জন। তিনি পশ্চিমিধারায় চলা মেয়ে নন, রীতিমতো সুপুরী কাটতেন, প্রতিদিন তরকারী কাটার আসরে তিনি উপস্থিত থাকতেন, বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে দেখাশোনা করতেন। কারো জ্বর হলো শিয়রে কাদম্বরী, কারো অন্য সমস্যা ছুটলেন কাদম্বরী। গৃহস্থালী কাজের প্রতি কাদম্বরীর প্রচন্ড আগ্রহ ছিল। সদ্য মাতৃহারা দেবর বালক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও তিনি পরম স্নেহে সেসময় তার কাছে টেনে নেন, অথচ কতোই বা বয়স কাদম্বরীর তখন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে বয়সে তিনি মাত্র এক বছরেরইতো বড়।

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের যা কিছু সুন্দর তার সব কিছুর সাথে জড়িয়ে আছেন কাদম্বরী। তিনি এ বাড়িতে এসে তিন তলার ছাদে গড়ে তুললেন “নন্দন কানন”। পিল্পের উপর বসানো হলো সারি সারি পাম গাছ, আশে পাশে চামেলী, গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা, করবী, দোলনচাপা। তার সাথে এলো নানা রকম পাখী। ঘর সাজানোর দিকে প্রথম থেকেই কাদম্বরীর প্রখর দৃষ্টি ছিল। দেখতে দেখতে ঠাকুরবাড়ির চেহারা তিনি পালটে দিলেন। কিশোর রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যবোধকে তিনি সবচেয়ে উচু তারে বেধে দিয়েছিলেন, যা থেকে রবীন্দ্রনাথ আর কখনো সরে আসতে পারেননি। মাত্র কয়েক বছরেই প্রায় অশিক্ষিত এই বালিকাটি ঠাকুর পরিবারের মতো বিখ্যাত পরিবারের সাহিত্যের প্রানকেন্দ্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজে কিছুতেই অংশ গ্রহন করতেন না। অপরকে প্রেরণায় উজ্জীবিত করাই ছিল তার ব্রত। যেটাকে প্রচলিত অর্থে বলা হয় রোমান্টিক সৌন্দর্যবোধ, তা কাদম্বরীর পুরোমাত্রায়ই ছিল। হয়তো ঠাকুরবাড়ীতে অনুকুল পরিবেশ পেয়ে তা তরতর করে বেড়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল কিন্তু তার ভিতরে তিনি সেটা বহু আগে থেকেই লালন করতেন। নইলে এ বাড়ির প্রানপুরুষকে জাগিয়ে দিতে তিনি যতোটা সফল হয়েছিলেন, অন্যকেউই তা পারেননি। কাদম্বরীকে নিয়ে এতো বেশী আলোচনার কারন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং। কিশোর রবীন্দ্রনাথের মানসিক গঠনে কাদম্বরীর ভুমিকা অসামান্য। তার অকালমৃত্যু রবীন্দ্রনাথের মনের মধ্যে গভীর ছাপ রেখে যায়, যা তার অসংখ্য গল্পে, কবিতা, গানে তিনি প্রকাশ করেছেন। যারা অনেক কিছু কল্পনা করতে ভালোবাসেন তাদেরকে সেসব কল্পনা করার রাস্তা তৈরী করে দিয়েছেন কবি নিজেই। তিনি নিজেও জানতেন সেকথা। যার জন্যে তিনি কৌতুক করে শেষ বয়সে লিখেছিলেন, “ভাগ্যিস নতুন বৌঠান মারা গিয়েছিলেন, তাই আজোও তাকে নিয়ে কবিতা লিখছি, বেচে থাকলে হয়তো বিষয় নিয়ে মামলা হতো” ।

Comments

Popular posts from this blog

**কষ্টকে ভালোবেসে আমি কবি হবো**

আমাদের দুজনার পৃথিবী দুটো শুরু থেকে আলাদা, তোর পুতুল খেলার সংসার, রংচঙে সাজানো গোছানো, তোর চুলের ক্লিপ, ধোয়া তোয়ালে,পোশাক রং মেলানো, আমিও সেই জগতের পভোলা এক পথিক শুধু, কখনও ভ্রমর হয়ে ফুলের থেকে চুরি করে একটু মধু, বাদবাকি খোঁচা-খোঁচা দাড়ি-গোঁফে,আমি কালো সাদা, আমাদের দুজনার পৃথিবী দুটো শুরু থেকেই আলাদা । আমার ভালো লাগে মেঘলা আকাশ, এক-পশলা ইলশেগুঁড়ি, রাতজাগা পাখির ডাক আর পুর্নিমাতে চাঁদেরবুড়ি, সেই জগতে কোনোখানেও ভুল করেও আসবিনা তুই, অথচ সবের পরেও দুইজনেতে একই খাটেই শুই, একই ঘরে দুজনার দুই পৃথিবী বাঁচবে আধা-আধা, আমাদের দুজনার পৃথিবী দুটো শুরু থেকেই আলাদা । তোর সাথে রং মিলিয়ে আমি, চাইলে হয়ত পাল্টাতেও পারি, তোকেও হয়ত ভুল বুজিয়ে, আমার জগতে ডেকে নিতে পারি, কিন্তু সেতো নিছক জীবনের সাথে সমঝোতাই হবে, দুই পৃথিবীর দুটো জীবন তখন কি আর জীবন-খুঁজে পাবে ? ----------------------------------------------------------------------------- সমুদ্র হোক বা পাহাড়, নদী হোক বা পর্বত, দৃষ্টির আরাম-খুজতে আমরা সবাই ছুটে যেতে চাই । আর,শুধু কি চোখের আরাম ? সাথে কাজের বিরাম, মুখের আরাম,সঙ্গে পেটে একটু রঙিন জল পড়লে, প...

*** শ্রীজাত **

ভাঙছে ঠুনকো আড্ডা সাতটা লাল চা, বিস্কুট দাম মেটাচ্ছে খুচরো। অল্প-অল্প বৃষ্টি একলা হাঁটছি, আস্তে স্বপ্ন বলতে চাকরি অস্ত্র বলতে ধান্দা সত্যিমিথ্যে বন্ধু পেট গোলাচ্ছে, যাক গে ফিরতে ফিরতে রাত্তির ভাত সামান্য ঠান্ডা খাচ্ছি, গিলছি, ভাবছি ছোট্টো একটা জানলার পাল্লা ভিজছে হয়তো, নীলচে শান্ত পর্দা একটু-একটু দুলছে, চুল গড়াচ্ছে বিছনায়, পাতলা, স্বচ্ছ নাইটি… -------------------------------------------------------------------------- সহজভাবে পড়তে আসি দরাজ পাঁচিল, রোদের চিকন হালকা সেসব শব্দ, তবু তোমরা বল দেওয়াল লিখন সহজভাবে দেখতে আসি টুকরো কাপড়, রঙের মজা হাওয়ায় কেমন দিব্যি ওড়ে, তোমরা বল জয়ধ্বজা সহজভাবে শুনতে আসি ভালই লাগে আমারও গান সুরের যত রকমসকম - তোমরা বল দাবি, স্লোগান সহজভাবে হাঁটতে আসি আলগা পায়ে আলতো হোঁচট পথের ধারে খোলামকুচি তোমরা বল বিরুদ্ধজোট এসব যদি সহজ না হয় সহজ তবে বলব কাকে? তার চাইতে তোমরা বরং জটিল করে দাও আমাকে। ------------------------------------------------------------------------- সারারাত ঝড়ের পরে তোমার কাছে আসা ভেবেছি শিখিয়ে দেব সকালবেলার ভাষা সকালের গাছগুলো সব নিথর, জড়োসড়ো অভি...

***ভালোবাসা পুঁজি করে নেমে পড় জীবনযুদ্ধে ***

একটা ব্যাকডেটেড মেয়ে খুজে নাও । যে ভালোবাসি বলার আগে তিনবার হোচট খাবে । মাঝে মাঝে হাল্কা শাসনে যে মনে করিয়ে দিবে জীবনের কথা । এত্তোগুলা ভালোবাসা পুঁজি করে নেমে পড় জীবনযুদ্ধে । বাসের ভিড়েপরম যত্নে শরীর দিয়ে আড়াল কর তার খোপার উদ্দেশ্যে কিনে নেয়া রক্তগোলাপটাকে। একটা ভালো ছবি তুলে বেড়ে যাক তোমাদের ভালোবাসা । শীতার্ত সন্ধ্যায় চায়ের কাপ টুকু ভাগাভাগি করে বুঝে নাও তোমাদের ভাল থাকার অধিকার। কপালে নেমে আসা ওর দুএকটা চুলে আঙ্গুল বোলাও অবুঝ আহ্লাদে । কোন এক শীতার্ত দুপুরে কোনও পার্কে ডুব দাও তার ঠোঁটের আটলান্টিকে। শুধু একটা ব্যাকডেটেড মেয়ে খুজে নাও ... ভালোবাসার থার্মোমিটার ফাটিয়ে দাও!!! ---------------------------------------------------------------------- আমার শব্দ চয়নে আভিজাত্য নেই; প্রতিদিনকার চাল,ডাল, লবণ পিয়াজের মতো নিত্যনৈমিত্তিক খাবারে মতো সাধারণ শব্দে আমার কাব্য যেমন সাধারণ আমার পরিধেয়। তোমাকে ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় বিলাসিতা! যদি আমাকে ভালবেসে পাশে থাকো তবে আমি চিরকাল সাধারণই থাকবো যা আমার আমিত্বের প্রকাশ। আমি সব হারাতে প্রস্তুত; কিন্তু আমার...