কৃষ্ণকলি
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলাদিনে দেখেছিলেম মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে,
মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে
ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই,
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে
কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই।
আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু
শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
পূবে বাতাস এল হঠাত্ ধেয়ে,
ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ।
আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা,
মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ।
আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে,
আমি জানি আর জানে সেই মেয়ে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
এমনি করে কাজল কালো মেঘ
জ্যৈষ্ঠমাসে আসে ঈশান কোণে।
এমনি করে কালো কোমল ছায়া
আষাঢ়মাসে নামে তমাল-বনে।
এমনি করে শ্রাবণ-রজনীতে
হঠাত্ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
আর যা বলে বলুক অন্য লোক।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
মাথার পরে দেয়নি তুলে বাস,
লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
====================================================
==============================================================
আকাশলীনা
- জীবনানন্দ দাশ
সুরঞ্জনা, অইখানে যেয়োনাকো তুমি,
বোলোনাকো কথা অই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা :
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;
ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;
দূর থেকে দূরে - আরও দূরে
যুবকের সাথে তুমি যেয়োনাকো আর।
কী কথা তাহার সাথে?
- তার সাথে!
আকাশের আড়ালে আকাশে
মৃত্তিকার মতো তুমি আজ :
তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে।
সুরঞ্জনা,
তোমার হৃদয় আজ ঘাস :
বাতাসের ওপারে বাতাস -
আকাশের ওপারে আকাশ।
=============================================================
শুধু তোমার জন্য
--নির্মলেন্দু গুণ
কতবার যে আমি তোমোকে স্পর্শ করতে গিয়ে
গুটিয়ে নিয়েছি হাত-সে কথা ঈশ্বর জানেন।
তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও
কতবার যে আমি সে কথা বলিনি
সে কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
তোমার হাতের মৃদু কড়ানাড়ার শব্দ শুনে জেগে উঠবার জন্য
দরোজার সঙ্গে চুম্বকের মতো আমি গেঁথে রেখেছিলাম
আমার কর্ণযুগল; তুমি এসে আমাকে ডেকে বলবেঃ
‘এই ওঠো,
আমি, আ…মি…।‘
আর অমি এ-কী শুনলাম
এমত উল্লাসে নিজেকে নিক্ষেপ করবো তোমার উদ্দেশ্যে
কতবার যে এরকম একটি দৃশ্যের কথা আমি মনে মনে
কল্পনা করেছি, সে-কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য,
আমার গায়ে জ্বর এসেছে তোমার জন্য,
আমার ঈশ্বর জানেন- আমার মৃত্যু হবে তোমার জন্য।
তারপর অনেকদিন পর একদিন তুমিও জানবে,
আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য। শুধু তোমার জন্য।
====================================================================
"একটা ছিল সোনার কন্যা"
#-হুমায়ূন_আহমেদ
একটা ছিল সোনার
কন্যা মেঘবরণ কেশ
ভাটি অঞ্চলে ছিল
সেই কন্যার দেশ
দুই চোখে তার
আহারে কি মায়া
নদীর জলে পড়ল
কন্যার ছায়া
তাহার কথা বলি
তাহার কথা বলতে বলতে
নাও দৌঁড়াইয়া চলি ।
কন্যার ছিল দীঘল চুল,
তাহার কেশে জবা ফুল
সেই ফুল পানিতে ফেইলা
কন্যা করল ভুল
কন্যা ভুল করিস না
ও কন্যা ভুল করিস না ।
আমি ভুল করা কন্যার
লগে কথা বলব না
হাত খালি, গলা খালি,
কন্যার নাকে নাকফুল
সেই ফুল পানিতে ফেইলা
কন্যা করল ভুল ।
এখন নিজের কথা বলি
নিজের কথা বলতে বলতে নাও
দৌঁড়াইয়া চলি ।
সবুজ বরণ লাউ ডগায়
দুধসাদা ফুল ধরে
ভুল করা কন্যার লাগি
মন আনচান করে
আমার মন আনচান করে ।।
====================================================================
"তুমি ফিরবে "
—সমরেশ মজুমদার
তুমি ফিরবে কোন একদিন
হয়তো নীলিমায় হারানো কোন এক নিষ্প্রভ
বেলায়।
নতুবা কোন এক নবীন হেমন্তে,
এক নতুন দিনের নির্মল খোলা হাওয়ায়।
অথবা কোন এক শ্রাবণের দিনে
অহরহ ঝরা ঘন কাল মেঘ বৃষ্টির
মুহু মুহু নির্ঝর খেলায়।
তুমি ফিরবে কোন এক রাতে
পূর্ণিমার ভরা জোছনায়।
তুমি ফিরবে জানি বহুদিন পরে
হয়তো বা হাজার বছর পরে।
কোন এক নিঃস্ব হৃদয়ে,
লক্ষ্য প্রাণের ভিড়ে, তুমি ফিরবে।
বহুরুপে সেই প্রাণে, অনেক নবীনের ভিড়ে,
তোমার আমার গড়া ভালবাসার নীড়ে।
==========================================================================
ভালবাসি, ভালবাসি”
___সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ধরো কাল তোমার পরীক্ষা,রাত জেগে পড়ার
টেবিলে বসে আছ,
ঘুম আসছে না তোমার
হঠাত করে ভয়ার্ত কন্ঠে উঠে আমি বললাম-
ভালবাস? তুমি কি রাগ করবে?
নাকি উঠে এসে জড়িয়ে ধরে বলবে,
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো ক্লান্ত তুমি, অফিস থেকে সবে ফিরেছ,
ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত পীড়িত..
খাওয়ার টেবিলে কিছুই তৈরি নেই,
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ঘর্মাক্ত আমি তোমার
হাত ধরে যদি বলি- ভালবাস?
তুমি কি বিরক্ত হবে?
নাকি আমার হাতে আরেকটু
চাপ দিয়ে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো দুজনে শুয়ে আছি পাশাপাশি,
সবেমাত্র ঘুমিয়েছ তুমি
দুঃস্বপ্ন দেখে আমি জেগে উঠলাম শশব্যস্ত
হয়ে তোমাকে ডাক দিয়ে যদি বলি-ভালবাস?
তুমি কি পাশ ফিরে শুয়ে থাকবে?
নাকি হেসে উঠে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি দুজনে,মাথার উপর
তপ্ত রোদ,বাহন
পাওয়া যাচ্ছেনা এমন সময় হঠাত দাঁড়িয়ে পথ
রোধ করে যদি বলি-ভালবাস?
তুমি কি হাত সরিয়ে দেবে?
নাকি রাস্তার সবার দিকে তাকিয়ে কাঁধে হাত
দিয়ে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো শেভ করছ তুমি,গাল কেটে রক্ত পড়ছে,এমন
সময়
তোমার এক ফোঁটা রক্ত হাতে নিয়ে যদি বলি-
ভালবাস?
তুমি কি বকা দেবে?
নাকি জড়িয়ে তোমার গালের রক্ত আমার
গালে লাগিয়ে দিয়ে খুশিয়াল
গলায় বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো খুব অসুস্থ তুমি,জ্বরে কপাল পুড়েযায়,
মুখে নেই রুচি, নেই কথা বলার
অনুভুতি,
এমন সময় মাথায় পানি দিতে দিতে তোমার
মুখের
দিকে তাকিয়ে যদি বলি-ভালবাস?
তুমি কি চুপ করে থাকবে?নাকি তোমার গরম
শ্বাস আমার
শ্বাসে বইয়ে দিয়ে বলবে ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো যুদ্ধের দামামা বাজছে ঘরে ঘরে,প্রচন্ড
যুদ্ধে তুমিও অঃশীদার,
শত্রুবাহিনী ঘিরে ফেলেছে ঘর
এমন সময় পাশে বসে পাগলিনী আমি তোমায়
জিজ্ঞেস করলাম-
ভালবাস? ক্রুদ্ধস্বরে তুমি কি বলবে যাও?
নাকি চিন্তিত আমায় আশ্বাস
দেবে,বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো দূরে কোথাও যাচ্ছ
তুমি,দেরি হয়ে যাচ্ছে,বেরুতে যাবে,হঠাত
বাধা দিয়ে বললাম-ভালবাস? কটাক্ষ করবে?
নাকি সুটকেস ফেলে চুলে হাত
বুলাতে বুলাতে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি
ধরো প্রচন্ড ঝড়,উড়ে গেছে ঘরবাড়ি,আশ্রয় নেই
বিধাতার দান এই
পৃথিবীতে,বাস করছি দুজনে চিন্তিত তুমি
এমন সময় তোমার
বুকে মাথা রেখে যদি বলি ভালবাস?
তুমি কি সরিয়ে দেবে?
নাকি আমার মাথায় হাত রেখে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো সব ছেড়ে চলে গেছ কত দুরে,
আড়াই হাত মাটির নিচে শুয়ে আছ
হতভম্ব আমি যদি চিতকার করে বলি-ভালবাস?
চুপ করে থাকবে?নাকি সেখান থেকেই
আমাকে বলবে ভালবাসি, ভালবাসি..
যেখানেই যাও,যেভাবেই থাক,না থাকলেও দূর
থেকে ধ্বনি তুলো
ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসি..
দূর থেকে শুনব তোমার কন্ঠস্বর,বুঝব
তুমি আছ,তুমি আছ
ভালবাসি, ভালবাসি...........
==========================================================================
"শেষের কবিতা"
____রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কালের যাত্রার
ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
তারি রথ নিত্য উধাও।
জাগিছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন
চক্রে পিষ্ট আধারের বক্ষ-
ফাটা তারার ক্রন্দন। ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার
জাল
তুলে নিল দ্রুতরথে
দু'সাহসী ভ্রমনের পথে তোমা হতে বহু দূরে।
মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম
আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়;
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম। ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।
কোনদিন কর্মহীন পূর্ণো অবকাশে
বসন্তবাতাসে অতীতের তীর
হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
ঝরা বকুলের
কান্না ব্যাথিবে আকাশ,
সেইক্ষণে খুজে দেখো, কিছু মোর
পিছে রহিল সে তোমার প্রাণের প্রানে,
বিস্মৃতি প্রাদোষে
হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু
নামহারা স্বপ্নে মুরতি।
তবু সে তো স্বপ্ন নয়, সব চেয়ে সত্য মোর সেই মৃত্যুঞ্জয় -
সে আমার প্রেম।
তারে আমি রাখিয়া এলাম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার
উদ্দেশ্যে।
পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়।
হে বন্ধু বিদায়।
তোমায় হয় নি কোন ক্ষতি।
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই
দিয়ে অমৃতমুরতি যদি সৃষ্টি করে থাক
তাহারি আরতি
হোক তবে সন্ধ্যা বেলা-
পূজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের
ম্লান স্পর্শ লেগে; তৃষার্ত আবেগবেগে
ভ্রষ্ট্র নাহি হবে তার কোন ফুল
নৈবদ্যের থালে।
তোমার মানস
ভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর ত'ষায় তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের
জলে ভিজে।
আজও তুমি নিজে
হয়তো বা করিবে বচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নবিষ্ট তোমার বচন
ভার তার না রহিবে,
না রহিবে দায়।
হে বন্ধু বিদায়।
মোর লাগি করিয় না শোক-
আমার রয়েছে কর্ম রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শুন্যেরে করিব পূর্ণো, এই ব্রত
বহিব সদাই।
উ'কন্ঠ আমার লাগি কেহ
যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে সে ধন্য করিবে আমাকে।
শুক্লপখক হতে আনি
রজনী গন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে
সে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায়
ভালমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায়
তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
তোমারে যা দিয়েছিনু তার
পেয়েছ নিশেষ অধিকার। হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করূন মুহূর্তগুলি গন্ডুষ
ভরিয়া করে পান
হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম,
ওগো নিরূপম,
হে ঐশ্বর্যবান তোমারে যা দিয়েছিনু
সে তোমারই দান,
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ
আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।
=================================================================
- কি করছো?
– ছবি আকঁছি।
- ওটা তো একটা বিন্দু।
– তুমি ছুঁয়ে দিলেই বৃত্ত হবে। কেন্দ্র হবে তুমি। আর আমি হবো বৃত্তাবর্ত।
- কিন্তু আমি যে বৃত্তে আবদ্ধ হতে চাই না। আমি চাই অসীমের অধিকার।
– একটু অপেক্ষা করো। . . . এবার দেখো।
- ওটা কি? ওটা তো মেঘ।
– তুমি ছুঁয়ে দিলেই আকাশ হবে। তুমি হবে নি:সীম দিগন্ত। আর আমি হবো দিগন্তরেখা।
- কিন্তু সে তো অন্ধকার হলেই মিলিয়ে যাবে। আমি চিরন্তন হতে চাই।
– আচ্ছা, এবার দেখো।
- একি! এ তো জল।
– তুমি ছুঁয়ে দিলেই সাগর হবে। তিনভাগ জলের তুমি হবে জলকন্যা। আর আমি হবো জলাধার।
- আমার যে খন্ডিতে বিশ্বাস নেই। আমার দাবী সমগ্রের।
– একটু অপেক্ষা করো। এবার চোখ খোল।
- ওটা কি আঁকলে? ওটা তো একটা হৃদয়।
– হ্যাঁ, এটা হৃদয়। যেখানে তুমি আছো অসীম মমতায়, চিরন্তন ভালোবাসায়। এবার বলো আর কি চাই তোমার?
- সারাজীবন শুধু ওখানেই থাকতে চাই।
…
=============================================================================
‘‘তুই কি আমার দুঃখ হবি?’’
___আনিসুল হক
তুই কি আমার দুঃখ হবি?
এই আমি এক উড়নচন্ডী আউলা বাউল
রুখো চুলে পথের ধুলো
চোখের নীচে কালো ছায়া
সেইখানে তুই রাত বিরেতে স্পর্শ দিবি।
তুই কি আমার দুঃখ হবি?
তুই কি আমার শুষ্ক চোখে অশ্রু হবি?
মধ্যরাতে বেজে ওঠা টেলিফোনের
ধ্বনি হবি?
তুই কি আমার খাঁ খাঁ দুপুর
নির্জনতা ভেঙে দিয়ে
ডাকপিয়নের নিষ্ঠ হাতে
ক্রমাগত নড়তে থাকা দরজাময়
কড়া হবি?
একটি নীলাভ এনভেলাপে পুরে রাখা
কেমন যেন বিষাদ হবি?
তুই কি আমার শুন্য বুকে
দীর্ঘশ্বাসের বকুল হবি?
নরম হাতের ছোঁয়া হবি?
একটুখানি কষ্ট দিবি,
নীচের ঠোট কামড়ে ধরা রোদন হবি?
একটুখানি কষ্ট দিবি
প্রতীক্ষার এই দীর্ঘ হলুদ বিকেল
বেলায়
কথা দিয়েও না রাখা এক কথা হবি?
একটুখানি কষ্ট দিবি।
তুই কি একা আমার হবি?
তুই কি আমার একান্ত এক দুঃখ হবি?
========================================================================
"ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত"
_____তসলিমা নাসরিন
ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত, তবু
এখনো কেমন যেন হৃদয় টাটায়-
প্রতারক পুরুষেরা এখনো আঙুল ছুঁলে
পাথর শরীর বয়ে ঝরনার জল ঝরে।
এখনো কেমন যেন কল কল শব্দ শুনি
নির্জন বৈশাখে, মাঘ-চৈত্রে-
ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত, তবু
বিশ্বাসের রোদে পুড়ে নিজেকে অঙ্গার করি।
প্রতারক পুরুষেরা একবার ডাকলেই
ভুলে যাই পেছনের সজল ভৈরবী
ভুলে যাই মেঘলা আকাশ, না-ফুরানো দীর্ঘ রাত।
একবার ডাকলেই
সব ভুলে পা বাড়াই নতুন ভুলের দিকে
একবার ভালোবাসলেই
সব ভুলে কেঁদে উঠি অমল বালিকা।
ভুল প্রেমে তিরিশ বছর গেল
সহস্র বছর যাবে আরো,
তবু বোধ হবে না নির্বোধ বালিকার।
================================================================
পুনর্বার ফিরে যাওয়া
— রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
যাবো না বলে সিদ্ধান্ত স্থির
তবু যেতে হলো তার কাছে
যেতে হলো,যেতে যেতে
যেতেই হলো,
অনুগত ভৃত্যের মতো দাঁড়াতে হলো
করজোড়ে বিড়ম্বিত বিবেকের বুক
রক্তাক্ত করে তবু যেতে হলো।
আবার ধরা দিতে হলো
ফেলে আসা স্মৃতির বাহুবেষ্টনে
পুনর্বার রোমন্থন এসে নিবিড়
আলিঙ্গনে হয়ে গেল সংলগ্ন ।
অভিমান ভাঙা সন্তান যেমন
অনায়াসে ফিরে যায় মায়ের বুকে
আমাকেও তেমনি ফিরে যেতে হলো
তার কাছেই ফিরে যেতে হলো।
ব্ল্যাকবোর্ডে পুরাতন লেখার মতো
মুছে ফেলতে হলো দগ্ধ দ্বিধা
মনরোম ডাস্টারে ।
তবু ফিরে যেতে হলো, ফিরে
যেতে যেতে যেতে হলো,
ফিরে যেতে হলো।
=====================================================================
I always wanted more from you
than you were willing to give;
So now we've gone our separate ways
each with different lives to live.
The bond will always be there
the friendship always intact;
But the time for us has come and gone
and the pages of time, you can't turn back.
I will always be a friend to you
and wonder how you are;
The smiles and laughter I will remember
and our fights have become painless scars.
Sometimes on those busy days
when you've a thousand things to do;
Please let me glide slowly through your mind
and spend some time with you.
In that quiet moment
when you're surprised to find me there;
Just remember even with the distance between us
I am still someone who cares.
_______ আর্নেস্তো চে গুয়েভারা
================================================================
‘কুয়ার ধারে’’
___রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার কাছে চাইনি কিছু,
জানাই নি মোর নাম,
তুমি যখন বিদায় নিলে
নীরব রহিলাম।
একলা ছিলেম কুয়ার
ধারে নিমের ছায়াতলে,
কলস নিয়ে সবাই তখন
পাড়ায় গেছে চলে।
আমায় তারা ডেকে গেল,
‘আয় গো বেলা যায়।’
কোন্ আলসে রইনু বসে
কিসের ভাবনায়।।
পদধ্বনি শুনি নাইকো
কখন তুমি এলে,
কইলে কথা ক্লান্তকন্ঠে–
করুণচক্ষু মেলে–
‘তৃষাকাতর পান্থ আমি।’
শুনে চমকে উঠে
জলের ধারা দিলেম
ঢেলে তোমার করপুটে।
মর্মরিয়া কাঁপে পাতা,
কোকিল কোথা ডাকে–
বাবলা ফুলের গন্ধ ওঠে
পল্লীপথের বাঁকে।। যখন তুমি শুধালে নাম
পেলেম বড়ো লাজ–
তোমার মনে থাকার
মতো করেছি কোন্ কাজ! তোমায় দিতে পেরেছিলাম
একটু তৃষার জল,
এই কথাটি আমার মনে
রহিল সম্বল। কুয়ার ধারে দুপুরবেলা
তেমনি ডাকে পাখি,
তেমনি কাঁপে নিমের পাতা–
আমি বসেই থাকি।।
=================================================================
তোর প্রথম ফোন কল
আমি এখনও ভুলিনি
তোর সেই সুমিষ্ট হাসি
এখনও আগের মতই ভালবাসি
শেষ বেঞ্চে বসতাম শুধু তোকে দেখবো বলে
পিছনে ফিরে তাকাবি তুই কথা বলার ছলে
সেই মায়াবী চোখের চাহনি আর মুচকি হাসি
এখনও আগের মতই ভালবাসি
তুই দিতি miss call, back করতাম আমি
আমার কাছে ছিল সবচেয়ে তোর sms দামি
পড়তি তুই সারাদিন-রাত
ফোনে বলতি বইয়ের সাথে নেই সাক্ষাত
তাই শুনে আমি দিতাম ঘুম
কল্পনার রাজ্য বানাতাম স্কুলের ক্লাস রুম
তুই ভাবতি শুধুই friend
আমি ভাবতাম girlfriend
প্রপোজ যেদিন করলাম তোকে
তুই করলি unfriend
=================================================================
মৃত্যু
--- ফারহাদ আহমাদ নিপুণ
অবাধ সত্য মৃত্যুর সামনে জীবনটা বড়
ক্ষুদ্র আর
ফ্যাকাশে হয়ে আসে৷
বর্ণিল প্রজাপতিময় ক্ষণগুলো মুখ
লুকায়;
পরাজিত চোখের ছায়াহীন নিমীলিত
আড়ে৷
চেতনা হারিয়ে যেতে চায় সবুজের
কোলঘেঁষা স্বচ্ছ নদীর উন্মাতাল
তরঙ্গে৷
বাধা হয়ে দাঁড়ায় অবিচলিত সময়৷
জীবনের এ এক নিত্য খেলা; মরীচিকার
সঙ্গে ৷
==========================================================
তোমায় নিয়ে
.........
তোমায় নিয়ে ভেসে যাবো
সাত সাগরের পারে ।
নতুন কথায় গাইবো গান ভালোবাসার সুরে ।
তোমায় নিয়ে চলে যাবো
চাঁদের ঠিকাণায় ।
জোস্ন্যা আলো ছড়িয়ে দিবো
তোমার আঙ্গিণায় ।
তোমায় নিয়ে উড়ে বেড়াবো
দূর আকাশের গাঁয় ।
তোমার দেহ রাঙ্গিয়ে দিবো
শুভ্র নীলিমায় ।
তোমায় নিয়ে হারিয়ে যাবো
গভীর অরণ্যে ।
ফুলে ফুলে সাজাবো তোমায়
খুব যতণে
=======================================================================
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় কাজী নজরুল ইসলাম
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়
সেকি মোর অপরাধ?
চাঁদেরে হেরিয়া কাঁদে চকোরিণী
বলে নাতো কিছু চাঁদ।।
চেয়ে চেয়ে দেখি ফোটে যবে ফুল
ফুল বলে নাতো সে আমার ভুল
মেঘ হেরি 'ঝুরে' চাতকিনী
মেঘ করে নাতো প্রতিবাদ।
জানে সূর্যেরে পাবে না
তবু অবুঝ সূর্যমুখী
চেয়ে চেয়ে দেখে তার দেবতারে
দেখিয়াই সে যে সুখী।।
হেরিতে তোমার রূপ মনোহর
পেয়েছি এ আঁখি, ওগো সুন্দর
মিটিতে দাও হে প্রিয়তম মোর
নয়নের সেই সাধ।।
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি
সেকি মোর অপরাধ?
=======================================================================
বাংলার মুখ
- জীবনানন্দ দাশ
বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর : অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে
চেয়ে দেখি ছাতার মতো ব্ড় পাতাটির নিচে বসে আছে
ভোরের দয়েলপাখি - চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ
জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের-অশথের করে আছে চুপ;
ফণীমনসার ঝোপে শটিবনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে;
মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে
এমনই হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ
দেখেছিল; বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে -
কৃষ্ণা-দ্বাদশীর জোৎস্না যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায় -
সোনালি ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল, হায়,
শ্যামার নরম গান শুনেছিল - একদিন অমরায় গিয়ে
ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়
বাংলার নদ-নদী-ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।
===================================================================
ভালোবাসার কবিতা লিখবো না
---
নিজের নাম বানারের মতো আজ
খুবএকা হয়ে যাচ্ছি ।
সন্ধ্যার নদী, আবছা ছায়ার মতো
খুব একা হয়ে যাচ্ছি ।
অগ্নিশিখার মতো, দুপুরের পায়রার মতো
খুব একা হয়ে যাচ্ছি ।
যুবতী যার হাতে শুধু একখণ্ড শূন্যতা,
গ্রামের সবুজ খোঁপায় নামা সূর্যের মতো
খুব একা হয়ে যাচ্ছি ।
যে কান্নার শব্দে উড়াল মারে কালেরহাত,
তারায় ভরা রাতের মতো
খুব একা হয়ে যাচ্ছি ।
ঘাসফুল, ফুল, পাখি, ফড়িং, ভাঙ্গাচোরা
আয়না, জায়নামাজ পিতার একা সিজদার মতো
খুব একা হয়ে যাচ্ছি ।
বিধবা প্রিয়তমার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস একান্তে,
হৃদয়ের তন্ত্রী কাঁপে যন্ত্রণার মতো
খুব একা হয়ে যাচ্ছি ।
ছোঁয়ামাত্র জেগে ওঠে স্মৃতি প্রেমময়ী প্রিয়
নারীর উদরে, একটি জিজ্ঞাসার মতো
খুব একা হয়ে যাচ্ছি- একা হয়ে যাচ্ছি ।
তোমাকে ভালোবাসি তাই
ভালোবাসার কবিতা লিখিনি ।
আমার ভালোবাসা ছাড়া আর
কোনো কবিতা সফল হয়নি,
আমার এক ফোঁটা হাহাকার
থেকে এক লক্ষ কোটি ভালোবাসার কবিতার জন্ম
হয়েছে।
আমার একাকীত্বের এক শতাংশ
==========================================================================
সূর্য সকাল
...............
এই মেয়ে ,
প্রকৃতির সাথে কেন
তোমার এতো মাখামাখি !
ঠোঁটের রঙে জ্বল জ্বল করে
সূর্য সকাল।
চোখে ভাসে নীল আকাশ
এলো মেলো #চুল ভিজে
ঝর ,ঝর, ঝর বৃষ্টির জলে
বাতাস সে জল শুষে নিয়ে
কপাল জুরে বিছানা পাতে
আলোড়িত চুম্বনের।
রোদ্রের তিন রঙা ঝিকিমিকি
খেলার ছলে ছলাৎ করে
দুপুর নামে সর্বাঙ্গে
তাপের পশরায় লাজে মরো
কলাপাতায় জড়ানো
এই মেয়ে তুমি !
চাইলে প্রসন্ন বিকেল
স্নিগ্ধতায়
গোধূলি লগ্নে
বুকে জড়িয়ে নিতে পারে
তোমায় ।
ভাব আর প্রকৃতির মাঝেই থাকো
হাতে নিয়ে
তুমি আমার ভালোবাসার মুকুট
পরেছো মাথায় !
আমাকে শোষণের
নামে তৈরি করেছো আত্মরক্ষার মৃন্ময়ী যৌবন।
বলো বলো হে ম্লান মেয়ে,
এতো স্পর্ধা কেন তোমার?
ভালোবাসার ঔরসে আমার জন্ম!
অহংকার আমার জননী!
তুমি আমার কাছে নতজানু
হও,তুমি ছাড়া আমি
আর কোনো ভূগোল জানি না,
আর কোনো ইতিহাস কোথাও পড়িনি ! আমার একা থাকার পাশে তোমার
একাকার হাহাকার নিয়ে দাঁড়াও!
হে মেয়ে ম্লান মেয়ে তুমি তোমার
হাহাকার নিয়ে দাঁড়াও!
আমার অপার করুণার
মধ্যে তোমারও বিস্তৃতি ! তুমি কোন দুঃসাহসে তবে
আমার স্বীকৃতি চাও, হে ম্লান
মেয়ে আমার স্বীকৃতি চাও কেন? তোমার মূর্খতা ক্ষমার অযোগ্য
অপরাধে,
পৃথিবীটা পুড়ে যাবে
হেলেনের গ্রীস হবে পুনর্বার
আমার
কবিতা ! এই ভয়ে প্রতিশোধস্পৃহায়
আজো আমি ভালোবাসার
কবিতা লিখিনি
কোনোদিন ভালোবাসার
কবিতা লিখিনি ।
হে মেয়ে হে ম্লান মেয়ে
তোমাকে ভালোবাসি তাই
ভালোবাসার
কবিতা আমি কোনোদিন
কখনো লিখবো না!

Comments
Post a Comment