Skip to main content

► তোমার দুইটি হাতে পৃথিবীর মৌলিক কবিতা ◄

 


আমাকে আমার কখনোই ভাল লাগেনি
সেই ছেলেবেলা থেকে আমার কানগুলো খরগোশের মতো
নাকের উপরকার দিকটা ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক
আমার হাঁসার ভঙ্গি টাও বেশ বেমানান
আর চোখের ভাষা তো আমি নিজেই পড়তে পারিনি জীবনে।

একবার প্রেম আমাকে ধোঁকা দিয়ে গেল দারুন
আমি বুঝবার চেষ্টা করছিলাম, ভুলটা কোথায়
দেখলাম, আমার হাত কচলানো ভঙ্গিটাই নচ্ছার
প্রেমের সামনে আমি যেন ক্রীতদাসের একটা পুরনো প্রতিচ্ছবি।

অনেক বছর পর আজ একটা লোক আমায় টিটকিরি দিয়ে গেল
বাড়ী ফিরে আয়নায় নিজেকে মেলাতে গিয়ে হোঁচট খেলাম
এই আমিটা তো কক্ষনোই আমি ছিলাম না, হতেও চাইনি
এরপরেও কি তুমি বলবে, আমাকে তোমার দারুন লাগে!


-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


আমি বার বার বুঝতে চেয়েছি আমাকে
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুঁজেছি এক একটি যতি চিহ্ন
জীবনের বাঁকে বাঁকে ফোটা ঘাসফুল, বসন্তের রঙ, কাল বৈশাখের তাণ্ডব
দেখতে চেয়েছি কোন অসুখের কবলে মুচড়ে গেছে মনুষ্যত্ব!
কোন ভাঙনের তোড়ে ভেসে গেছে অনন্ত যৌবনের বীরত্ব।

আমি শুধু দেখতে চেয়েছি আমারই হাসির লাবণ্য
যার অভাবে তুমি ফিরিয়েছ মুখ
ছুঁড়ে দিয়েছ আক্ষেপের জ্বল জ্বলা অগ্নিদহন;

আমি জন্মেছি চির অরণ্যের জঠরে
আমার বুকের পাঁজরে সুবাসিত বসন্তের কুসুমিত উষ্ণতা
মমতার ধর্মে নির্লোভ প্রেমে-
উদ্ভাসিত জীবনে চেতনায় সুসজ্জিত আমার আদর্শ!
তোমার ছেড়ে যাবার সাফাই অভিযোগ
আর যাই হোক “অবহেলা” হতে পারেনা!

তুমি ছেড়ে যাবে- যাও
তোমাকে অবহেলার অভিযোগে আমাকে দোষী করোনা
আমি অযোগ্যতার অপমান মেনে নেবো;
অবহেলার অভিযোগ কোন দিন না।

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------



আমায় একটা শব্দ দাও – আমি তোমার জন্যিই হবো কবি
আমায় একটু ছোঁয়া দাও
আমি তোমার জন্যিই সাজবো চির জীবন্ত ছবি।
(২)

যদি হাত বাড়াও- তবে
পেতে দেবো বুক
যদি ঠোঁট বাড়াও
এনে দেবো অমর্ত্য সুখ।
(৩)

তোমার শিশির ভেজা বারান্দায় আমি শিউলি হয়ে আসবো
আমি তোমার নিঃশ্বাসে সাথে পৌঁছে যাবো তোমার প্রাণের স্পন্দনে
তোমার হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আমি উম্মুল ঘ্রাণ ছড়াবো
এমনই এক বসত গড়বো দুজনে মিলে নির্জনে সৃজনে।
(৪)

তোমার আত্মা হতে যেই প্রতিধ্বনি শুনি
আমি সেই সুর জানি
আমি চিনি তার রাগ, তাল
মৃদঙ্গ তালে আমি নাচি নিমগ্ন মাতাল।


------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
কবিতার নীলচে ভালোবাসা
চারপাশের নোংরা পরিবেশ
সমাজের বাঁকা চোখ
পুরুষের বিছানো জাল
কাপুরুষের কালো থাবা
আপনের বেশে শত্রুর আঘাত
বন্ধুর পথের ক্লান্তি
বেঈমানির সাত রঙ
সর্বনাশের ষোলকলা
সরলতার ফায়দা
ভালোবাসার মিথ্যে কথন
বিশ্বাসের নিরব দহন
বিসর্জনের অপরিমেয় লজ্জা
পরের জন্য নিজের ঘর উজাড়

অতপর......
এখনো টিকে আছি
বেঁচে-ও আছি
হারানোর যন্ত্রণার হয়েছে অবসান
আর কিছু নেই হারাবার
তাই ভয়ও নেই
চিল আর শকুন চক্ষুলজ্জা গিলে খেয়েছে
ঠোঁটকাটা বানর খেয়েছে ভাষা
কবিতার মাঝে হারিয়ে গেছে
আমার নীলচে ভালোবাসা!



------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

আমি সযত্নে, সগোপনে লুকিয়ে রাখছিলাম
আমার অনুভূতি
প্রায়ই অভিনয়ে ফাঁক থেকে যাচ্ছিল ,
ভুলগুলো ছিল ইচ্ছাকৃত
এখন এমনটাই বুঝি
যা আমাকে অবাক করেছিল
যদি একবারো আমাকে পাবার
তৃষ্ঞা তুমি প্রকাশ করে ফেল
পথের কুকুরের মত তোমার জুটবে ধিক্কার
লুটিয়ে পড়বে মিথ্যে ঐশ্বর্যের পায়ের
কাছে বারবার
এই নির্মম সত্য তুমি গ্রহণ করেছ হাসিমুখে
তাই প্রত্যেকবার তোমার হাসি আমার
হৃদয়ে বেঁধে
আমাকে গুড়িয়ে দেয় , আর অভিনয়ে ভুল হয়
ইচ্ছাকৃত সব ভুল


----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

এরপর হঠাত্ একদিন শাঁ করে উঠে যাব শহরের ওয়াচ টাওয়ারে,
কাঁদব খুব ;
কান্নার জলে বন্যায় ধুয়ে মুছে সাফ হবে জনবসতি ,
ধুয়ে যাবে শহরের ধূসর অতীত, প্রাচীন কিছু চিনচিনে ব্যথা ;
এরপর গাছে গাছে সেঁটে দেব লক্ষ লক্ষ ব্যর্থ প্রেমের কবিতা-
ব্যস, এজন্মে আমার আর এটুকুই কাজ বাকি ।

তারও হাজার বছর পর
কোনও পালতোলা সপ্তডিঙায় ভেসে যেতে যেতে
একদিন কলম্বাসের মতোই তুমি নতুন করে আবিষ্কার করবে এই নগরীকে,
দোহাই তোমার , নাম দিও অদ্রিজানগরী ।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে উঠে আসবে আমার পচাগলা কঙ্কাল ,
আর তরতাজা কিছু স্বপ্ন ,
দোহাই তোমার, এজন্মে আমার স্বপ্নগুলো তোমার কাছেই গচ্ছিত রেখো,
পরের জন্মে কড়ায় গন্ডায় ফেরত নেব সব ।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------

ওরা আমাকে চটি লেখক বলল।
আমি বললাম, আমি চটি লিখি নি,
এই দেখ, পড়ে যাও, কি সুন্দর কবিতা লিখেছি!
আর এই যে গল্পটা, কি অদ্ভুত সুন্দর!

সবাই চটি লেখে না,
এখানে আমরা কবিতা লিখি, গল্প লিখি, প্রবন্ধ-
দিনপন্জি কত কিই না লিখি,
বিশ্বাস না হয় একদিন এসো আমার ব্লগ বাড়ী।

এরপর একদিন ওরা আমাকে নাস্তিক বলল
আমি বললাম, আমি নাস্তিক না
এই দেখ আমি নিয়মিত উপাসনালয়ে যায়
আমার লেখাগুলো পড়ে দেখ
ধর্মের কত কি জানি, কত কিই না লিখেছি।

সবাই নাস্তিক না
এখানে আমরা সিংহভাগী আস্তিক
ঈশ্বরের অনুকম্পা ভিখারী
তৃতীয় বিশ্বের সমস্যাসংকুল দেশে
ও ছাড়া যে আমাদের পথ নেই মুক্তির।

এরপর একদিন আমাকে বেশ্যা বলল
আমি আবারও বলার চেষ্টা করলাম
আমি বেশ্যা নয়,
আমি বেশ্যা নয়-
আমার চরিত্রে কালিমা লেপন করোনা
পাপ হবে তোমাদের, আমি তোমাদের মতই পুত পবিত্র।
আমার শরীর এখনো অস্পর্শ্য বিশ্বাস না হয়
এই দেখ পরীক্ষা করে যাও আমার অনাবৃত দেহ।

আশ্চর্য্য!

আমরা সবাই বলতে পারি না চুতমারানি
তুই চটি পড়িস তাই তোর কাছে সব লেখায় চটি মনে হয়।

বলতে পারি নি,
মাদারচোত নাস্তিকতার তুই কি বুঝিস?
আস্তিকতার সার্টিফিকেট আর
বেহেশতের টিকিট দেবার অধিকার তোকে কে দিল?

বলিনি বেজন্মার জাত বেশ্যার সাথে শুয়ে শুয়ে
তোর মাকে তুই বেশ্যা ভাবছিস?

বলিনি কারন, আমরা যে অহিংস
আমরা যে সুশিল
আমাদের যে সব কথা বলতে নেই
আমাদেরও যে মুখোশ খুলে যাবার ভয়।

নিকুচি করি এই সুশিলতার
নিকুচি করি এই অহিংসতার
ঝেড়ে ফেলি আজ মনের যত ক্ষোভ
ভেঙে ফেলি সব ক্ষাপা মোষের ঘাড়।

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

প্রিয় ধরে নিয়েছি
এই চিঠিটা তুমিই পাঠিয়েছ
দোয়েলের শিষে করে —–
আমার রুপোর বাক্সে আমি তুলে রেখেছি
চুলের কাঁটা, কানের দুল আর টিপের সাথে
এই টিপ সাক্ষী তোমার ভালবাসার
কেননা সে প্রজাপতির মত আমার কপালে বসেছিল
তুমি বসিয়েছিলে বলে,
খোঁপার ঐ রুপোর কাঁটা সাক্ষী -
সে জেনেছিল কি করে
আমার চুলে সেজেগুজে বসে যেতে হয় -
আর তোমার চোখকে মুগ্ধ করে দিতে হয় -
আজ এই টিপ এই চুড়ি আর এই খোঁপার কাঁটা
একাকী রাত্রি যাপন করে
শুধু তুমি তুমি তুমি নেই বলে
চলে গিয়েছো
একশ বছর ঘুমাবে বলে
আমিও আমার মন আর শরীর তুলে রেখেছি
ঐ রূপোর বাস্কেটে
তোমার চিঠির সাথে থাকুক
আমিও না হয় একশ বছর ঘুমুবো।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

যে মুঠোফোনের নাম্বার মৃত ছিল
সেই নাম্বার থেকে আজ কল এসেছে
আমার ভুল হৃদয় ভুল শুনলো কি ?
জানি নে ।

প্রিয় হাতে নিয়ে বসে আছি
সবটুকু হৃদয়
শুধুমাত্র একটি কলের জন্য ।
আমার হাত পা মুখ
এখন সব হৃদয়ের অংশ
আর শুধুই হৃদয়ের আজ্ঞাবহ ।

তারা শুন্য অবস্থান থেকে ক্রমেই
শুন্যে উত্তরণ করে
আমি বসে আছি অনন্তকাল
অথবা হাজার বছর

যে নম্বর মরে গিয়েছে
সে আজ রিনরিনে সুরে নক করে
আমাকে আজ সে পুনরায় আকাশ দেখাবে
বলে আমি মৃত আত্মাদের মধ্যে থেকে
ফের হৃদয়ের আজ্ঞাবহ হই ।

মস্তিষ্ক এখন বোধ এবং বুদ্ধিকে অতিক্রান্ত করে
আমাকে প্রেমের কাছে সমর্পণ করে
আমি আজ আবার হৃদয়কে তার বুকের বাঁপাশে
দিয়ে দেব বলে
হাত পা ছেড়ে দিয়ে
ফের আকাশ দেখছি ।

---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

কি সুখ পাও বলো?
বলো কোন তৃপ্তির আড়ালে লুকিয়ে রাখো নিজেকে।
জানো-
শ্রাবণ আসেনি এখনো; তবু
আকাশে মেঘের ঘনঘটা, বাতাসে বৃষ্টির অভিমান
রোদ্রের দেখা মিলেনি সকাল থেকে
তোমার ভাবনায় স্মৃতির পাতা হয়ে আছে ম্লান।

বলো, কি সুখ পাও?
আড়ালের চরাচরে গুপ্ত নিঃশ্বাসের ভারী শূন্যতা
দিক দিগন্তে খুঁজেছি, ডেকেছি নাম ধরে
নিথর স্তব্ধতা ভেঙ্গে করেছি খান খান; অবনীতা
তুমি শুনেও কি দাও না জবাব? নাকি
বধির হয়ে দেখছো আমার রুধীরাক্ষের নির্মমতা!

আড়ালের সীমান্তে পৌঁছে দিই আমার আত্ম চিৎকার
বাতাসের কানে কানে বলে দিই তোমার আমার গোপন কাহিনী
রাতের অন্ধকারে উড়িয়ে দিই সমস্ত সাধ আহ্লাদ
ভোরের পাখির সঙ্গে প্রহর গুনি নতুন একটি দিনের
আর সম্যক আকুতিতে অপেক্ষায় থাকি উন্মোচনের তোমার
আড়ালের বাঁধ ভেঙ্গে আসো আলোর জোয়ারে
অভিমান ভুলে হেসো আরেকটিবার;
আমি তোমার জন্য লিখবো সহস্র নতুন কবিতা
বুনবো অজস্র স্বপ্নের বারতা।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

হঠাৎ করে যেদিন দেখা হয়ে যাবে,
পড়ন্ত বিকেল কিংবা জেগে উঠা ভোরে !
খুব কি বিভ্রত হবে ?
এড়িয়ে যাবে নাকি না চেনার ভানে ?
নাকি ভদ্রতা রক্ষার কিংবা সুখের নিদর্শন শেষ হাসি দিয়ে,
আবার আমায় জ্বালিয়ে দিবে ? ?
বিশ্বাস করো সে দিন আমি চোখের কোণ ভিজতে দেবোনা,
আমার মুখেও হাসি থাকবে,
কত কষ্ট সে হাসির আড়ালে
হয়তো সে তুমি বুঝবেনা,
হয়তো সেটাকে সুখ ভেবে
অন্য সবার মত তুমিও ভুল বুঝবে…
কখনো আমায় বুঝোনি তুমি,হয়তো সেইদিনো বুঝবেনা ।

-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


তোর খুব ইচ্ছে ছিল
একদিন বৃষ্টিতে ভিজে,
মেঘলা পথে রিক্সায় ঘুরবো
তাই নারে ?
আধ-খোলা চোখের সমস্ত আকাশ
মেঘে মেঘে আড়মোড়া ভাঙছে,
আজও বোধ হয় ঘোরা হবে না
তোর ভেজা চুলে ভেজা হবে না আমার,
তোর খুব ইচ্ছে ছিল
হাতে হাত রেখে হাঁটবি এমন দিনে,
বিন্দু বিন্দু বৃষ্টি কণা
ভিজিয়ে যাবে আমাদের !

খুব বেশি ইচ্ছে ছিল তোর
বৃষ্টিতে ভিজে একদিন,
উড়ে যাবি রুমালির মতো ডানা মেলে
বাদল দিনে গান গেয়ে;
রিমঝিম শব্দের সাথে তোর চুড়ির
মিতালী হবে
পুরো শহরের বৃষ্টি ঝরে পড়বে একে একে
আমাদের শরীর বেয়ে ।
খুব ইচ্ছে ছিল, তাই নারে ?
একদিন বৃষ্টিতে ভিজে
কোটি চোখ ফাঁকি দিয়ে,
আজও বোধ হয় ঘোরা হবে না
তোর মাতাল চোখে চোখ রেখে
নিরুদ্দেশ হবার
প্রতিজ্ঞা করা হবে না আমার ।।


---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

মিলিয়ে ফেলেছি ছন্দ ..কি আনন্দ কি আনন্দ ..
পিঠ চাপড়ে হেভিসে মান্জা মেরে,
বিভোর সুখে আয়নায় দেখি নিজেরে,

জঘন্য ভেংচি কেটে ..আয় হায় বলছে সে কে ..!
ওরে বুদ্ধু হাঁদারাম হয়েছিস কবি ..!
ফেলেছিস বুঝে সবই ..নারীর হাড়ির মতি গতি ..!

প্রেমের ঠিকানায় পেয়ে চিঠি ..মনে কত ভাব পিরীতি ..!
আয় হায় আয়নাই যে বলছে সত্যি ...!!!
নিজের ঠিকানার মিল নেই একরত্তি ...
প্রেমের চিঠির খামে ..ঠিকানাটা তো দেখি অন্য বানানে ..!
আমার মেলানো ছন্দ গুলো ..সত্য আয়নায় যে দেখায় ..
প্রবন্ধ মতো,কঠিন শিলা সম ...!

ভাষার গাথুনিতে ছন্দ কোথায় ..!
দেখাচ্ছে মাকড়ের জাল যতো ..!
অন্য বানানে লিখা কবিতারে ..প্রেমের চিঠি মনে করে,
গান্ডু তুমি ছবি দেখে কবি সেজে ..
পেড়িয়েছো সময় ..আর কতো ..আর কতো ..!

কবিতা এঁকেছে যে ছবি ..
নারীর হৃদয় পটে সে অন্য কবি ...!
বুঝেছিস থেতলানো কলার খোসা ..?
ততোদিন অপেক্ষায় রইবি ...
মাকড়ের জালের প্রবন্ধ প্রিয়,
সঠিক ঠিকানার ছবি না পাবি ...!

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


কবিতা মুর্তিমতী
— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

শুয়ে আছে বিছানায়, সামনে উম্মুক্ত নীল
খাতা
উপুড় শরীর সেই রমণীর, খাটের
বাইরে পা দু’খানি
পিঠে তার ভিজে চুল,
এবং সমুদ্রে দু’টি ঢেউ
ছায়াময় ঘরে যেন কিসের সুদন্ধ,
- জানায়
রৌদ্র যেন জলকণা, দূরে নীল নক্ষত্রের
দেশ।

কী লেখে সে, কবিতা?
না কবিতা রচনা করে তাকে?

সে বড় অসি’র, তার চোখে বড় বেশী অশ্রু
আছে
পাশ ফেরা মুখখানি-
এখন স্তব্ধতা মূর্তিমতী-
শাড়ির অমনোযোগে কোমরের নগ্ন
বারান্দায়
একটি পাহাড়ী দৃশ্য,
সবুজ সতেজ উপত্যকা
কেন বা নদী ও নয়?
অথবা সে অপার্থিবা বুঝি।

কী লেখে সে, কবিতা?
না কবিতা রচনা করে তাঁকে?

নগরে হঠাৎ বৃষ্টি, বৃষ্টিতে দুপুর ভেসে যায়
সে দেখেনি, সে শোনেনি কোনো শব্দ
যেন এক দ্বীপ
যেখানে হলুদ বর্ণ
রক্তিমকে নিমন্ত্রণে ডাকে
অথবা সে জলকণ্যা
দু’বাহুতে হীরকের আঁশ
ক্রমশ উজ্জল হয় আঙুলে কলম চিক্রার্পিত..

কী লেখে সে, কবিতা?
না কবিতা রচনা করে তাকে?

---------------------------------------------------------------------------------

তোমার জন্যে এই
মাঠে আমি সবুজ রেখেছিলাম ।
তোমার জন্যেই আমি গাছের
নীচে ছায়া রেখেছিলাম।
তোমার জন্যে আমি পাহাড়ের
কাছে হাত পেতে বলেছিলাম,
- ও পাহাড় তুমি নদীর
স্বরলিপি লেখো।
শুনেছিলাম তুমি বহু দূর
ভূমধ্য সাগর হেঁটে ফিরছ ,
তোমার জন্যেই এখানে,এই
ঘাসে আমি আঁচল পেতেছিলাম ।

------------------------------------------------------------------------------------------


নারী ও শিল্প
-- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ঘুমন্ত নারীকে জাগাবার
আগে আমি তাকে দেখি
উদাসীন গ্রীবার ভঙ্গি, শ্লোকের মতন ভুরু
ঠোঁটে স্বপ্ন বিংবা অসমাপ্ত কথা
এ যেন এক নারীর মধ্যে বহু নারী, বিংবা
দর্পণের ঘরে বস
চিবুকের ওপরে এসে পড়েছে চুলের
কালো ফিতে
সরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে না,
কেননা আবহমান কাল
থেকে বেণীবন্ধনের বহু উপমা রয়েছে..

আঁচল ঈষৎ সরে গেছে বুক থেকে-এর নাম
বিস্রস্ত,
এ রকম হয়
পেটের মসৃণ ত্বক, ক্ষীণ চাঁদ নাভি, সায়ার
দড়ির গিট
উরুতে শাড়ীর ভাঁজ, রেখার বিচিত্র
কোলাহল
পদতল-আল্পনার লক্ষ্মীর ছাপের মতো
এই নারী
নারী ও ঘুমন্ত নারী এক নয়
এই নির্বাক চিত্রটি হতে পারে শিল্প,
যদি আমি
ব্যবধান টিক রেখে দৃষ্টিকে সন্ন্যাসী করি
হাতে তুলে খুঁজে আনি মন্ত্রের অক্ষর
তখন নারীকে দেখা নয়, নিজেকে দেখাই
বড় হয়ে ওঠে বলে
নিছক ভদ্রতাবশে নিভিয়ে দিই আলো
তারপর শুরু হয় শিল্পকে ভাঙার এক বিপুল
উৎসব
আমি তার ওষ্ঠ ও উরুতে মুখ গুঁজে
জানাই সেই খবর
কালস্রোত সাঁতরে যা কোথাও যায় না। —

-------------------------------------------------------------------------------------------------------



ভালবাসা হলো
নিছক এক আনন্দময়ই ঝড়,
যে ঝড়ে ভিজতে অনেক ভালো লাগে,
কিন্তু ..........
ঝড় যখন থেমে যায়,
দুরত্ব আর শুকনো কিছু হিমেল হাওয়া
সব কিছু মলিন করে দিয়ে যায় |
ভালোবাসা হলো
দুইটি হৃদয়ের অপ্রকাশিত গল্প ,
যেখানে কোনো একটি হৃদয়ের চাহিদা কখনই পূরণ হয় না
তাই কিছু গল্প থেকে যায় অপূর্ণ |
ভলোবাসা হলো
তুমি আর আমি
যেখানে আমরা সপ্নের পৃথীবি করি পূর্ণ
কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন

----------------------------------------------------------------------------------------

উত্তর
– শামসুর রাহমান

তুমি হে সুন্দরীতমা নীলিমার
দিকে তাকিয়ে বলতেই পারো
‘এই আকাশ আমার’
কিন্তু নীল আকাশ কোনো উত্তর
দেবেনা।

সন্ধ্যেবেলা ক্যামেলিয়া হাতে নিয়ে
বলতেই পারো,
‘ফুল তুই আমার’
তবু ফুল থাকবে নীরব নিজের
সৌরভে আচ্ছন্ন হয়ে।

জ্যোত্স্না লুটিয়ে পড়লে তোমার ঘরে,
তোমার বলার অধিকার আছে, ‘এ
জ্যোত্স্না আমার’
কিন্তু চাঁদিনী থাকবে নিরুত্তর।

মানুষ আমি, আমার চোখে চোখ রেখে
যদি বলো, ‘তুমি একান্ত আমার’,
কী করে থাকবো নির্বাক ?
তারায় তারায় রটিয়ে দেবো,
‘আমি তোমার, তুমি আমার’।

---------------------------------------------------------------------------------------------------------------


উস্কোখুস্কো চুলের বাহার,
কপালের ঘাম মুখেতে,
ছিড়ছে জুতার শুকতলি,
আর পয়সা নাই যে পকেটে।

ঘরে ঢুকলে বাবার কের্ত্তন,
মা এর লাই দেয়া হাসি,
সমাজের আর সকলের কাছে,
আমি খোদার খাসি।

কি করছেন? কিছুই না।
উত্তর দিবো কতো,
বেকার টাইটেল নিয়ে আজ,
ঘুরছি অবিরত।

বেকার ছেলের মত বালাই,
এই দুনিয়ায় নাই,
সাধ করে কি আমরা সব,
বেকার থাকতে চাই?

চাকরির আশায় পার করি দিন,
ঘুরে ঘুরে হতাশ,
চাকরি করা দোস্ত দেখলে,
অপমান লাগে চটাস।

সকালে যাই রাতে ফিরি,
শান্তি নাই কপালে,
ঘরের সকল কাজে থাকি,
হয়ে সাক্ষী গোপালে।

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

আমি কোন আলো দেখি না ,
দেখি না কোন আশা ,
চারদিকে শুধুই হাহাকার ,অন্ধকার ,
কাউকে ভালবাসার ও নেই অধিকার ,
আমি অভিশপ্ত ,আমি একজন বেকার ।
আমি যেখানে তাকাই ,
যেদিকে যাই ,
আমায় নিয়ে মত্ত সবাই ,
হাসি আর তামাশায় ,
আমি যেন কিম্ভুতকিমাকার ,
আমি অভিশপ্ত ,আমি একজন বেকার ।
আমি দুঃখ আমি বোঝা ,
কারো কাছে সমাজের আগাছা ,
কেউ মনে করে কলঙ্কের ছাপ ,
কারো মতে আমার বেচে থাকাই পাপ ,
সদা কানে বাজে তুচ্ছ -তাচ্ছ্যিল্যের ঝংকার ,
আমি অভিশপ্ত ,আমি একজন বেকার ।
আমার কাছে স্নেহ মায়া ভালবাসা ,
সব যেন বিলুপ্ত ,
আমার জন্য কষ্ট কান্না ,
এ সবি বিশুদ্ধ ,
আমি কষ্ট পেলে হয় ন্যাকামি ,
আবার হাসলে সেটা বোকামি ,
আমি শুধুই আমার ,
আমি অভিশপ্ত ,আমি একজন বেকার ।

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

আমার জীবন ভালোবাসাহীন গেলে
কলঙ্ক হবে কলঙ্ক হবে তোর,
খুব সামান্য হৃদয়ের ঋণ পেলে
বেদনাকে নিয়ে সচ্ছলতার ঘর

বাঁধবো নিমেষে। শর্তবিহীন হাত
গচ্ছিত রেখে লাজুক দু’হাতে আমি
কাটাবো উজাড় যুগলবন্দী হাত
অযুত স্বপ্নে। শুনেছি জীবন দামী,

একবার আসে, তাকে ভালোবেসে যদি
অমার্জনীয় অপরাধ হয় হোক,
ইতিহাস দেবে অমরতা নিরবধি
আয় মেয়ে গড়ি চারু আনন্দলোক।

দেখবো দেখাবো পরস্পরকে খুলে
যতো সুখ আর দুঃখের সব দাগ,
আয় না পাষাণী একবার পথ ভুলে
পরীক্ষা হোক কার কতো অনুরাগ।

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

এমন অনেক দিন গেছে
আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থেকেছি,
হেমন্তে পাতা-ঝরার শব্দ শুনবো ব’লে
... নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছি বনভূমিতে-
কোনো বন্ধুর জন্যে
কিংবা অন্য অনেকের জন্যে
হয়তো বা ভবিষ্যতেও অপেক্ষা করবো…
এমন অনেক দিনই তো গেছে
কারো অপেক্ষায় বাড়ি ব’সে আছি-
হয়তো কেউ বলেছিলো, “অপেক্ষা ক’রো
একসঙ্গে বেরুবো।”
এক শনিবার রাতে খুব ক্যাজুয়ালি
কোনো বন্ধু ঘোরের মধ্যে গোঙানির মতো
উচ্চারণ করেছিলো, “বাড়ি থেকো
ভোরবেলা তোমাকে তুলে নেবো।”
হয়তো বা ওর মনের মধ্যে ছিলো
চুনিয়া অথবা শ্রীপুর ফরেস্ট বাংলো;
-আমি অপেক্ষায় থেকেছি।
যুদ্ধের অনেক আগে
একবার আমার প্রিয়বন্ধু অলোক মিত্র
ঠাট্টা ক’রে বলেছিলো,
“জীবনে তো কিছুই দেখলি না
ন্যুব্জপীঠ পানশালা ছাড়া। চল, তোকে
দিনাজপুরে নিয়ে যাবো
কান্তজীর মন্দির ও রামসাগর দেখবি,
বিরাট গোলাকার চাঁদ মস্ত খোলা আকাশ দেখবি,
পলা ও আধিয়ারদের জীবন দেখবি,
গল্প-টল্প লেখার ব্যাপারে কিছু উপাদান
পেয়ে যেতেও পারিস,
তৈরী থাকিস- আমি আসবো”
-আমি অপেক্ষায় থেকেছি;
আমি বন্ধু, পরিচিত-জন, এমনকি- শত্রুর জন্যেও
অপেক্ষায় থেকেছি,
বন্ধুর মধুর হাসি আর শত্রুর ছুরির জন্যে
অপেক্ষায় থেকেছি-
কিন্তু তোমার জন্য আমি অপেক্ষায় থাকবো না,
-প্রতীক্ষা করবো।
‘প্রতীক্ষা’ শব্দটি আমি শুধু তোমারই জন্যে খুব যত্নে
বুকের তোরঙ্গে তুলে রাখলাম,
অভিধানে শব্দ-দু’টির তেমন কোনো
আলাদা মানে নেই-
কিন্তু আমরা দু’জন জানি
ঐ দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য অনেক,
‘অপেক্ষা’ একটি দরকারি শব্দ—
আটপৌরে, দ্যোতনাহীন, ব্যঞ্জনাবিহীন,
অনেকের প্রয়োজন মেটায়।
‘প্রতীক্ষা’ই আমাদের ব্যবহার্য সঠিক শব্দ,
ঊনমান অপর শব্দটি আমাদের ব্যবহারের অযোগ্য,
আমরা কি একে অপরের জন্যে প্রতীক্ষা করবো না ?
আমি তোমার জন্যে পথপ্রান্তে অশ্বত্থের মতো
দাঁড়িয়ে থাকবো-
ঐ বৃক্ষ অনন্তকাল ধ’রে যোগ্য পথিকের
জন্যে প্রতীক্ষমান,
আমাকে তুমি প্রতীক্ষা করতে বোলো
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবো অনড় বিশ্বাসে,
দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে
আমার পায়ে শিকড় গজাবে…
আমার প্রতীক্ষা তবু ফুরোবে না…


---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


আজ আমি আমাকে হাজারো ভাবে জানি ,
ডাকি আমি অসংখ্য নামে ।

যখন বুকের রাজ পথের অলি গলিতে কিছু
স্বপ্ন মলিন হয়ে পরে থাকতে দেখি ,
আমি তখন তাদের নাম দেই যন্ত্রণা ।

যখন মনের ছোট কুঠিরে আশা গুলোর
মুখ লুকানো রোদনের শব্দ শুনি ,
আমি তখন তাদের নাম দেই কষ্ট ।

যখন হাজারো মানুষের মাঝে
আমার আমি কে নিয়ে যায়
ভাবনার আকাশে ,
আমি তখন তাদের নাম দেই একাকীত্বতা ,

যখন তীব্র থেকে তীব্রতর করে চাওয়া পাওয়ার
লক্ষ আকুতির আত্ম চিৎকার শুনি ,
আমি তখন তাদের নাম দেই ভাঙ্গা হৃদয় ।

যখন নির্ঘুম রাত্রির এক একটা প্রহর ,
ভেবে ক্লান্ত এ মন হারিয়ে যায় অতীতে
আমি তখন তাদের নাম দেই চাপা কান্না ।

যখন নিথর এ চোখ ভিজে আসে ,
অশ্রু তে নয় বয়ে যায় কোন
কাঙ্ক্ষিত অলীক কামনায় ,
আমি তখন তাদের নাম দেই হারানো ভালোবাসা । _______




------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


অনন্ত, মেহিদি পাতা দেখেছ নিশ্চয়?
উপরে সবুজ, ভেতরে রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত-
নিজেকে আজকাল বড় বেশি মেহেদি পাতার মতো,
মনে হয় কেন?

উপরে আমি অথচ ভিতরে কষ্টের যন্ত্রনার-
এমন সব বড় বড় গর্ত যে-
তার সামনে দাড়াতে নিজেরী ভয় হয়, অনন্ত।
তুমি কেমন আছো?
বিরক্ত হচ্ছ না তো?

ভালোবাসা যে মানুষকে অসহায়ও করে তুলতে পারে-
সেদিন তোমায় দেখার আগ পর্যন্ত-
আমার জানা ছিলো না।
তোমার উদ্দাম ভালোবাসার দূতি-
জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে ফেলেছে আমার ভিতর-
আমার বাহির-
আমার হাতে গড়া আমার পৃথিবী।

অনন্ত, যেই মিথিলা শুখী হবে বলে-
ভালোবাসার পূর্ণ চঁন্দ গিলে খেয়ে-
ভেজা মেঘের মতো উড়তে উড়তে চলে গেল,
আজ অন্য শূন্য, অনন্তকে আরো শূন্য করে দিয়ে-
তার মুখে এসব কথা মানায় না,
আমি জানি-
কিন্তু আমি আর এভাবে এমন করে পারছি না
আমার চারদিকের দেয়াল জুড়ে থই থই করে-
আমার স্বপ্ন খুনের রক্ত।

উদাস দুপুরে বাতাসে শিষ দেয়
তোমার সেই ভালোবাসা
পায়ে পায়ে ঘুরে ফেরে ছায়ার মতোন-
তোমার স্বৃতি।
আমি আগলাতেও পারি না,
আমি ফেলতেও পারি না।
শুখী হতে চেয়ে এখন দাড়িয়ে আমি-
একলা আমি-
কষ্টের তুষার পাহারে।

অনন্ত তোমার সামনে দাড়ানোর কোন –
যোগ্যতাই আজ আমার অবশিষ্ট নেই।
তবুও,
তবুও তুমি একদিন বলেছিলে-
ভেজা মেঘের মতো-
অবুজ আকাশে উড়তে উড়তে-
জীবনের সুতোয় যদি টান পরে কখনো?
চলে এসো, চলে এসো-
বুক পেতে দেব-আকাশ বানাবো
আর হাসনা হেনা ফুটাবো।

সুতোয় আমার টান পরেছে অনন্ত,
তাই আজ আমার সবকিছু,
আমার এক রোখা জেদ,
তুমি হীনা শুখী অনেক স্বপ্ন!
সব, সবকিছু জলাঞ্জলী দিয়ে-
তোমার সামনে আমি নত জানু-
আমায় তোমাকে আর একবার ভিক্ষে দাও।
কথা দিচ্ছি- তোমার অমর্যাদা হবে না কোনদিন।

অনন্ত, আমি জানি-
এখন তুমি একলা পাষান কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়াও,
প্রচন্ড এক অভিমানে-
ক্ষনে ক্ষনে গর্জে উঠে অগ্নিগিরি।
কেউ জানে না, আমি জানি-
কেন তোমার মনের মাঝে মন থাকে না,
ঘরের মাঝে ঘর থাকে না,
উঠোন জোরার উপর কলস-
তুলসি তলের ঝড়া পাতা,
কুয়ো তলার শূন্য বালতি-
বাসন-কোসন, পূর্নিমা-অমাবর্ষা,
একলা ঘরে এই অনন্ত-
একা শুয়ে থাকা।
কেউ জানে না, আমি জানি-
কেন তুমি এমন করে কষ্ট পেলে-
সব হরিয়ে বুকের তলের চিতানলে-
কেন তুমি নষ্ট হলে?
কার বিহনে চুপি চুপি, ধীরে ধীরে-
কেউ জানে না, আমি জানি-
আমিই জানি।

আগামি শনিবার ভোরের ট্রেনে তোমার কাছে আসছি।
অনন্ত, আমার আর কিছু না দাও- অন্তত শাস্তিটুকু দিও।
ভালো থেকো!
তোমারি হারিয়ে যাওয়া মিথিলা।



-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------



"ফুটেছে ফুল, বিরহী তবু চাঁদ"
–মহাদেব সাহা

ফুটেছে ফুল ঠোঁটের মতো লাল
আকাশে চাঁদ বিরহী চিরকাল;
কে যেন একা গাইছে বসে গান
সন্ধ্যা নামে, দিনের অবসান।

দূর পাহাড়ে শান্ত মৃদু পায়ে
রাত্রি নামে স্তব্ধ নিঝুম গাঁয়ে;
শূন্যে ভাসে মেঘের জলাশয়
এই জীবনে সবকিছুই তো সয়।

বিরহী চাঁদ মোমের মতো গলে
বুকের মাঝে কিসের আগুন জ্বলে;
মন পড়ে রয় কোন অজানালোকে
নিজেকেই সে পোড়ায় নিজের শোকে।


----------------------------------------------------------------------------------------------------------------


ভালবাসি, ভালবাসি
___সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ধরো কাল তোমার পরীক্ষা,রাত জেগে পড়ার
টেবিলে বসে আছ,
ঘুম আসছে না তোমার
হঠাত করে ভয়ার্ত কন্ঠে উঠে আমি বললাম-
ভালবাস? তুমি কি রাগ করবে?
নাকি উঠে এসে জড়িয়ে ধরে বলবে,
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো ক্লান্ত তুমি, অফিস থেকে সবে ফিরেছ,
ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত পীড়িত..
খাওয়ার টেবিলে কিছুই তৈরি নেই,
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ঘর্মাক্ত
আমি তোমার
হাত ধরে যদি বলি- ভালবাস?
তুমি কি বিরক্ত হবে?
নাকি আমার হাতে আরেকটু
চাপ দিয়ে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো দুজনে শুয়ে আছি পাশাপাশি,
সবেমাত্র ঘুমিয়েছ তুমি
দুঃস্বপ্ন দেখে আমি জেগে উঠলাম শশব্যস্ত
হয়ে তোমাকে ডাক দিয়ে যদি বলি-ভালবাস?
তুমি কি পাশ ফিরে শুয়ে থাকবে?
নাকি হেসে উঠে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি দুজনে,মাথার
উপর
তপ্ত রোদ,বাহন
পাওয়া যাচ্ছেনা এমন সময় হঠাত দাঁড়িয়ে পথ
রোধ করে যদি বলি-ভালবাস?
তুমি কি হাত সরিয়ে দেবে?
নাকি রাস্তার সবার
দিকে তাকিয়ে কাঁধে হাত
দিয়ে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো শেভ করছ তুমি,গাল কেটে রক্ত পড়ছে,এমন
সময়
তোমার এক ফোঁটা রক্ত হাতে নিয়ে যদি বলি-
ভালবাস?
তুমি কি বকা দেবে?
নাকি জড়িয়ে তোমার গালের রক্ত আমার
গালে লাগিয়ে দিয়ে খুশিয়াল
গলায় বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো খুব অসুস্থ তুমি,জ্বরে কপাল পুড়েযায়,
মুখে নেই রুচি, নেই কথা বলার
অনুভুতি,
এমন সময় মাথায় পানি দিতে দিতে তোমার
মুখের
দিকে তাকিয়ে যদি বলি-ভালবাস?
তুমি কি চুপ করে থাকবে?নাকি তোমার গরম
শ্বাস আমার
শ্বাসে বইয়ে দিয়ে বলবে ভালবাসি,
ভালবাসি..
ধরো যুদ্ধের দামামা বাজছে ঘরে ঘরে,প্রচন্ড
যুদ্ধে তুমিও অঃশীদার,
শত্রুবাহিনী ঘিরে ফেলেছে ঘর
এমন সময় পাশে বসে পাগলিনী আমি তোমায়
জিজ্ঞেস করলাম-
ভালবাস? ক্রুদ্ধস্বরে তুমি কি বলবে যাও?
নাকি চিন্তিত আমায় আশ্বাস
দেবে,বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো দূরে কোথাও যাচ্ছ
তুমি,দেরি হয়ে যাচ্ছে,বেরুতে যাবে,হঠাত
বাধা দিয়ে বললাম-ভালবাস? কটাক্ষ করবে?
নাকি সুটকেস ফেলে চুলে হাত
বুলাতে বুলাতে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি
ধরো প্রচন্ড ঝড়,উড়ে গেছে ঘরবাড়ি,আশ্রয়
নেই
বিধাতার দান এই
পৃথিবীতে,বাস করছি দুজনে চিন্তিত তুমি
এমন সময় তোমার
বুকে মাথা রেখে যদি বলি ভালবাস?
তুমি কি সরিয়ে দেবে?
নাকি আমার মাথায় হাত রেখে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো সব ছেড়ে চলে গেছ কত দুরে,
আড়াই হাত মাটির নিচে শুয়ে আছ
হতভম্ব আমি যদি চিতকার করে বলি-
ভালবাস?
চুপ করে থাকবে?নাকি সেখান থেকেই
আমাকে বলবে ভালবাসি, ভালবাসি..
যেখানেই যাও,যেভাবেই থাক,না থাকলেও দূর
থেকে ধ্বনি তুলো
ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসি..
দূর থেকে শুনব তোমার কন্ঠস্বর,বুঝব
তুমি আছ,তুমি আছ
ভালবাসি, ভালবাসি........




-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------



► তোমার দুইটি হাতে পৃথিবীর মৌলিক কবিতা ◄
___মহাদেব সাহা

তোমার দুহাত মেলে দেখিনি কখনো
এখানে যে ফুটে আছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ
গোলাপ,
তোমার দুহাত মেলে দেখিনি কখনো
এখানে যে লেখা আছে হৃদয়ের গাঢ়
পঙক্তিগুলি।
ফুল ভালোবাসি বলে অহঙ্কার
করেছি বৃথাই
শিল্প ভালোবাসি বলে অনর্থক বড়োই
করেছি,
মূর্খ আমি বুঝি নাই তোমার দুখানি হাত
কতো বেশি মানবিক ফুল-
বুঝি নাই কতো বেশি অনুভূতিময়
এই দুটি হাতের আঙুল।
তোমার দুখানি হাত খুলে আমি কেন
যে দেখিনি,
কেন যে করিনি পাঠ এই শুদ্ধ প্রেমের
কবিতা।
গোলাপ দেখেছি বলে এতোকাল আমি ভুল
করেছি কেবল
তোমার দুইটি হাত মেলে ধরে লজ্জায়
এবার ঢাকি মুখ।
তোমার দুইটি হতে
ফুটে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ
গোলাপ,
তোমার দুইটি হাতে
পৃথিবীর একমাত্র মৌলিক কবিতা।




--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------



শুধু তোমার জন্য
____নির্মলেন্দু গুণ
কতবার যে আমি তোমোকে স্পর্শ
করতে গিয়ে
গুটিয়ে নিয়েছি হাত-সে কথা ঈশ্বর জানেন।
তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও
কতবার যে আমি সে কথা বলিনি
সে কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
তোমার হাতের মৃদু কড়ানাড়ার শব্দ
শুনে জেগে উঠবার জন্য
দরোজার সঙ্গে চুম্বকের
মতো আমি গেঁথে রেখেছিলাম
আমার কর্ণযুগল;
তুমি এসে আমাকে ডেকে বলবেঃ
‘এই ওঠো,
আমি, আ…মি…।‘
আর অমি এ-কী শুনলাম
এমত উল্লাসে নিজেকে নিক্ষেপ
করবো তোমার উদ্দেশ্যে
কতবার যে এরকম একটি দৃশ্যের
কথা আমি মনে মনে
কল্পনা করেছি, সে-কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য,
আমার গায়ে জ্বর এসেছে তোমার জন্য,
আমার ঈশ্বর জানেন- আমার মৃত্যু হবে তোমার
জন্য।
তারপর অনেকদিন পর একদিন তুমিও জানবে,
আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য। শুধু তোমার
জন্য।


-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------



কিভাবে বুঝবেন আপনি কারওপ্রেমে পড়েছেন

(১) আপনি বারবার ইনবক্সে গিয়ে তার মেসেজগুলো পড়বেন ।।

(২) যখন তার সাথে থাকবেন, তখন খুবই আস্তে আস্তে হাঁটবেন ।।
...

(৩) যখন তার কথা ভাববেন তখন আপনার হার্টবিট বেড়ে যাবে ।।

(৪) তার কথা মনে পড়লে আপ্নাআপ্নি মুখে হাসি চলে আসবে ।।

(৫) আপনি স্লো ট্র্যাকের গানগুলো বেশী বেশী করে শুনবেন ।।

(৬) আপনি ভাববেন তার জন্য আপনি যে কোন কিছু করতে পারবেন ।।

(৭) আর আপনি যখন এই পোস্টটি পড়ছেন তখন আপনার শুধু একজনের কথাই
মনে পড়ছে ।।




-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


নদীর জলে আগুন ছিল
আগুন ছিল বৃষ্টিতে
আগুন ছিল বীরাঙ্গনার
উদাস করা দৃষ্টিতে।
আগুন ছিল গানের সুরে
আগুন ছিল কাব্যে,
মরার চোখে আগুন ছিল
এ কথা কে ভাববে ?
কুকুর-বেড়াল থাবা হাঁকায়
ফোঁসে সাপের ফণা
শিং কৈ মাছ রুখে দাঁড়ায়
জ্বলে বালির কণা।
আগুন ছিল মুক্তিসেনার
স্বপ্ন-ঢলের বন্যায়-
প্রতিবাদের প্রবল ঝড়ে
কাঁপছিল সব অন্যায়।
এখন এসব স্বপ্নকথা
দূরের শোনা গল্প,
তখন সত্যি মানুষ ছিলাম
এখন আছি অল্প।


---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


"সেদিন চৈত্রমাস"
-----রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রহরশেষের আলোয়
রাঙা সেদিন চৈত্রমাস–
তোমার চোখে দেখেছিলাম
আমার সর্বনাশ।।

এ সংসারের নিত্য খেলায়
প্রতিদিনের প্রাণের মেলায়
বাটে ঘাটে হাজার লোকের
হাস্য-পরিহাস–
মাঝখানে তার তোমার
চোখে আমার সর্বনাশ।।

আমের বনে দোলা লাগে,
মুকুল প’ড়ে ঝ’রে–
চিরকালের চেনা গন্ধ
হাওয়ায় ওঠে ভ’রে।

মঞ্জরিত শাখায় শাখায়,
মউমাছিদের পাখায় পাখায়,
ক্ষণে ক্ষণে বসন্তদিন
ফেলেছে নিশ্বাস–
মাঝখানে তার তোমার
চোখে আমার সর্বনাশ।


---------------------------------------------------------------------------------------


বন্ধু
মানে একসাথে স্কুল
পালানো,
বন্ধু মানে ক্লাসের
সুন্দরী মেয়েকে পটানো
বন্ধু মানে - দোস্ত
মাল তো পটে গেছে
বন্ধুই বলে - যা কর
গিয়ে প্রেম নিবেদন
দেখব পথ
আগলে কে আসে ।
বন্ধু
মানে বেসুরা সুরে গান
করা,
বন্ধু মানে চলার
পথে হাত ধরা ।
বন্ধু মানে এক
রিকশায় তিন জন
গাদা গাদি করে বসা,
বন্ধু মানে মনের যত
আশা ।
বন্ধু মানে শত সুখের
মাঝেও কষ্ট পাওয়া,
বন্ধুর কারণেই
আখি বেয়ে পড়া অশ্রু
নিমিষেই
হারিয়ে যাওয়া ।
উৎসর্গ- আমার সব
বন্ধুদের..



----------------------------------------------------------------------------------------------------



ঘুম ভাঙার পর--
-- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ঘুম ভাঙার পর যেন আমার মন ভালো হয়ে যায়।
হলুদ-তেল মাখা একটি সকাল,
ঝর্নার জলে বৃষ্টিপাতের মতন শব্দ
ঝুল বারান্দার সামনের বাগানে কেউ হাসছে
শীতের রোদ্দুরের মতন।

কিছু ভাঙছে, কিছু খসে যাচ্ছে
বইয়ের পাতায় কার আঙুল, এখুনি যাবে অন্য পাতায়।
দিগন্ত থেকে ভেসে আসছে বিসর্জনের সুর
ঘুম ভাঙার পর যেন আমার মন ভালো হয়ে যায়।



-------------------------------------------------------------------


চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।

জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে-
জীবন সুন্দর
আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!

বিদায়ের সানাই বাজে
নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে
সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে
এই যে বেঁচে ছিলাম
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয় সবাইকে
অজানা গন্তব্যে।
হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি
অজান্তেই চমকে ওঠি
জীবন, ফুরালো নাকি!
এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে। —



-----------------------------------------------------------------------------------------------------


হাত -
- তসলিমা নাসরিন

আবার আমি তোমার হাতে রাখবো বলে হাত
গুছিয়ে নিয়ে জীবনখানি উজান ডিঙি বেয়ে
এসেছি সেই উঠোনটিতে গভীর করে রাত
দেখছ না কি চাঁদের নীচে দাঁড়িয়ে কাঁদি দুঃখবতী মেয়ে !

আঙুলগুলো কাঁপছে দেখ, হাত বাড়াবে কখন ?
কুয়াশা ভিজে শরীরখানা পাথর হয়ে গেলে ?
হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিলাম বর্ষা ছিল তখন,
তখন তুমি ছিঁড়ে খেতে আস্ত কোনও নারী নাগাল পেলে।

শীতের ভারে ন্যুব্জ বাহু স্পর্শ করে দেখি
ভালবাসার মন মরেছে, শরীর জবুথবু,
যেদিকে যাই, সেদিকে এত ভীষণ লাগে মেকি।
এখনও তুমি তেমন আছ। বয়স গেল, বছর গেল, তবু।

নিজের কাঁধে নিজের হাত নিজেই রেখে বলি :
এসেছিলাম পাশের বাড়ি, এবার তবে চলি।



-----------------------------------------------------------------------------------------------------


"ফুটেছে ফুল, বিরহী তবু চাঁদ"
–মহাদেব সাহা

ফুটেছে ফুল ঠোঁটের মতো লাল
আকাশে চাঁদ বিরহী চিরকাল;
কে যেন একা গাইছে বসে গান
সন্ধ্যা নামে, দিনের অবসান।

দূর পাহাড়ে শান্ত মৃদু পায়ে
রাত্রি নামে স্তব্ধ নিঝুম গাঁয়ে;
শূন্যে ভাসে মেঘের জলাশয়
এই জীবনে সবকিছুই তো সয়।

বিরহী চাঁদ মোমের মতো গলে
বুকের মাঝে কিসের আগুন জ্বলে;
মন পড়ে রয় কোন অজানালোকে
নিজেকেই সে পোড়ায় নিজের শোকে।

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------


প্রথম যেদিন তোমায় দেখেছিলাম ,
মনে হয়েছিল তুমি সদ্য ফোটা ,
কোন নিষ্পাপ ফুলের কলি ,
প্রথম যেদিন তোমায় ভেবেছিলাম ,
মনে হয়েছিল তুমি আমার ,
শুধুই আমার স্বপ্নের রাণী ,
প্রথম যেদিন দেখেছি ,
তোমার অশ্রুসিক্ত নয়ন ,
সেদিন ই প্রথম বুঝেছি ভালবাসা ।

মনে আছে তোমার ?
প্রথম যেদিন তুমি বলেছিলে ,
আমার হাতখানি ধর ,
বিনিময়ে তোমার সব কষ্ট
আমায় দাও ,
আমি বলেছিলাম ,কেন ?
বলেছিলে এরই নাম ভালবাসা ।
মনে আছে তোমার ?
প্রথম যেদিন বৃষ্টি ভেজা বিকেলবেলায় ,
আমরা হাটছিলাম একসাথে ,
হঠাত্‍ প্রচণ্ড ঝড় ,
তুমি শক্ত করে ,
আমার হাতটা ধরেছিলে ,
আমি অবাক নয়নে ,
তোমার দিকে তাকিয়েছিলাম ,
বলেছিলে এটাই ভালবাসা ।

ভালবাসা কাকে বলে ,
তুমিই প্রথম শিখিয়েছিলে ,
তুমিই তো বলেছিলে ,
ভালবাসা মানে সুখ নয় ,
ভালবাসা মানে সুখ-দুঃখের সমন্বয় ,
ভালবাসা মানে শুধুই পাওয়া
নয় ,
ভালবাসা মানে হারানো ও ,
ভালবাসা মানে ত্যাগ ,উত্‍সর্গ ।

আজ কত দূরে তুমি ,
তোমার দেওয়া ভালবাসার সংঙ্গা ,
এখনো ভুলিনি আমি ,
হয়ত ভুলে গেছ তুমি ,
হয়ত সে সব তোমার আর মনে নেই ,
হয়ত এখন অন্য কারো পৃথিবী জুড়ে তোমার বিচরণ ,
কিন্তু আমি ভুলিনি ,
চেয়ে ও ভুলতে পারি নি ,
তুমি যে শিখিয়েছিলে ,
ভালবাসা হল স্রোতস্বীনি নদী ,
সে আমৃত্যু বয়ে চলে ,
আজ ও বয়ে চলে ,চলবে আমৃত্যু ।


------------------------------------------------------------------------------------------------


জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি আমি...
অন্তরগর্ভে প্রতিক্ষারত
উত্তপ্ত ধাতু সকল...ফুটছে...
তীব্র আক্রোশে লেলিহান শিখা তুলছে,
এখুনি হয়তো ....আচমকা হবে নির্গত
আমার নাক - কান - মুখ ভেদ করে!!

আমি ভীষণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছি তাকে রোধ করতে...
প্রতিনিয়তঃ চলছে যুদ্ধ..আমার হৃদে!!
আমার চিত্ত উত্তপ্ত লাভার চাপে ক্রমশঃ....
হয়ে উঠছে দুর্বল...নিস্তেজ....

বুঝি আর পারা যায় না.....
বক্ষ বিদীর্ণ করে গলিত..উত্তপ্ত পাষাণ.ধাতুর.সংমিশ্রণে ..
তীব্র শক্তিশালী লাভা হবে নির্গত..

সবাই সরে যাও. তোমরা...কেউ এসোনা কাছে...
আমার নাই পরিত্রাণ..সাহায্য করোনা কেউ...এসোনা কাছে. ..

আমার শরীরের সমস্ত রক্তবিন্দু আজ..
লাভায় রূপান্তরিত...
বিষাক্ত - উত্তপ্ত - মারণাস্ত্রের মত অতি ভীষণ....
আমাকে একাই লড়তে দাও এর সাথে..
এসো না কেউ...এসোনা আমার কাছে||



--------------------------------------------------------------------------------------

শেষমেশ একসাথে জড়ো করে ফেলি আমার সমস্ত ভুল ,
সম্বোধন টুটে গেছে আজ,
থুথু দিই নিজেই নিজেকে,
ছিঃ ছিঃ করি আকাঙক্ষী পৌরুষে ;
হ্যাঁ তুমি , কেবল তুমিই পার
আমার সব ভুলে গঙ্গাজল ছিটাতে;
তুমিই পার এনে দিতে শুদ্ধতার সবুজ নিঃশ্বাস ;
এভাবেও তোমার কৃপাপ্রার্থী আমি ।

`মেঘদূতে' যক্ষের তবু কয়েকফালি মেঘ ছিল-
তারাই প্রিয়ার কানে পৌঁছে দিত বিরহী সংলাপ ;
মেঘেরা এখন অনেক বেশি কঠিন, নিষ্ঠুর তোমার থেকে;
সিগারেটের ধোঁয়ায় তাই আমার কান্না পাঠালাম ,
আবেগের অত্যুক্তি দেখে চিনে নিও তুমি ।

আজও একরাশ স্বপ্ন আছে আমার,
আর আছে শরীর ক্ষুইয়ে স্বপ্ন দেখার ঝক্কি ;
আজকাল পাশবালিশের গায়েই এঁকে ফেলি তোমার অদৃশ্য ঠোঁট -
মুহুর্মুহু চুম্বন চলে সারারাত ;
সংযমের সব বাঁধ ভেঙে গেছে আজ
ফারাক করতে পারিনা আর,
তোমার নয়- তোমার ছায়ার সাথে সংগমে প্রতিরাতে আমার হাজার হাজার সন্তানের মৃত্যু হয় ;
হ্যাঁ তুমি, কেবল তুমিই পার আমার পাথরে নতুন ভাস্কর্য বানাতে ;
তুমিই পার উচ্ছল প্রাণময়তা এনে দিতে ;

এভাবেও তোমার কৃপাপ্রার্থী আমি ।



-----------------------------------------------------------------------------------------------------------


"তুই তো বন্ধু চলেই গেলি "
"কাদিয়ে গেলি মোরে "
"ভাল থাকিস, কথা বলিস "
"আরকি বলি তোরে "।
"তুই তো বন্ধু চলেই গেলি " "আমায়
একা করে "
"এই হৃদয়ের ভালবাসা, যত আছে"
"সবই দিলাম তোরে "।
"তুই তো বন্ধু চলেই গেলি "
"পড়ছে স্মৃতি মনে "
"ঝরো ঝরো বৃষ্টিধারা"
"বইছে কেন মনে ? ''
"তুইতো বন্ধু চলেই গেলি " "আসিস আবার
ফিরে "
"হয়তো আমায় ভুলেই যাবি " "অনেক বন্ধুর
ভীড়ে "।

---------------------------------------------------------------------------------------------------

নিবিয়ে দাও আলো--
প্রতিরাতে এখন আর চাঁদের শাসন চলে না,
অহঙ্কারী সূর্যকে বলো
সে রোজ রোজ না এলে তেমন কিছু ক্ষতি হয় না আর ;ওরা দু'জন দুটো আগুনের ডেলা ছাড়া আর কিচ্ছু নয়,
যেন দুখন্ড তালমিছরি !
আমি এক ঢকেই গিলতে পারি তাদের;
তোমার চোখে ঠিকরে পড়েছে নীল জ্যোত্স্না -
ফুঁ দিয়ে ভেঙেছি চাঁদের অহঙ্কার ।
আজকাল আর প্রদীপও জ্বলেনা আঁধারে তুলসীতলায়,
স্বপ্নদের পথ আটকালে ক্যাকাফনি, ট্রাফিক জ্যাম ,
ল্যাম্পসেটের আলোয় খুঁজি তোমার কাঁচামুখ ।
হরিণী, হরিণী হয়ে ওঠো স্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নে অথবা ইন্দ্রজালে ।

এভাবে কেটে যায় দীর্ঘ রাত ;
বাস্তবতা চাবুক মারে আড়ষ্ট শরীরে,
তারপরেই সূর্য তোমার পোশাকে মুখ লুকায়,
থার্মোমিটারে ধরেনা সে উত্তাপ ,
পূব আকাশের সূর্যটা নেহাতই ছাপোষা তোমার কাছে ।


-------------------------------------------------------------------------------------------------------------


ঘাসের মত জীবন
রেলিং এ ঝুলছে রঙ্গিন কাপড় তোমার
সাদা সাদা মেঘ আকাশে
ঝুঁকে পরা জীবন অসচ্ছল
তোমাকে বুঝে নিয়েছে শুধু ভুবন আমার
নির্ঘুম রাত শেষ হবার পর
এইটুকু খড়কুটো মনে,
তুমি আছো বলে, শুধু তুমি আছো বলে -
এই সব বিচ্ছিন্নতা কিছু নয় ।

------------------------------------------------------------------------------------

শুভমকে || দেবেশ ঠাকুর

জানিস শুভম,কাল রাত্তিরে মা আমাকে খেতে দেয়নি,
ঋতব্রতর থেকে তিন নম্বর কম পেয়ে আমি সেকেন্ড হয়েছি বলে
মার্কশিট নিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই মা একচোট নিয়ে নিল,
বাঁদরের বাচ্চা,শুয়োরের ঝাড় এবারও সেকেন্ড!
মার্কশিট গুটিয়ে মুড়ে বকে বকে ফেলে দিল প্রেসার কুকার
গালে ব্লিচ,চোখে মাস্কারা ছিল বলে ভূতের মতো দেখাচ্ছিল
আমার ঘুড়িদুটো পটাপট ছিঁড়ে দিয়ে
কাঠিদুটো দিয়ে পেটাতে লাগল
যতক্ষণ না ভাঙে,

বিকেলে অফিস ফেরত বাবা এলে মা বলল,
ছেলেকে নিয়ে তুমিই থাকো এ বাড়িতে
আমি বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছি
আমি ঘুমোনোর ভান করে শুয়ে ওদের কথাগুলো শুনছিলাম

টিনটিনের বইগুলো ছিঁড়ে দিল,ভেঙে দিল টয়গানটাও
শুভম,আমি বোধহয় কোনোদিনই ঋতব্রতকে টপকাতে পারব না,
তুই থার্ড হয়েছিস বলে নিশ্চয়ই বাড়িতে পিটুনি খেয়েছিস,

শুভম,রেজাল্ট বেরোনোর দিন আমার যে কি ভয় করে তোকে বোঝাতে পারব না,
আরও ভয় করে মা যখন স্কুলে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করে
খাতা যাচাই করে ফিরে আসে-
ওঃ কীভাবে যে বাড়িতে ঢুকি-
শুভম,ওই তিন নম্বরের ফাঁড়া যদি না কাটে
আমার সামনে কোনো রাস্তাই খোলা নেই
আমাকে নিয়ে বাবা মার মধ্যে সুখ নেই,
ওদের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ।
আমাকে নিয়ে মার সঙ্গে ঝগড়া, মাস্টারমশাই এর সঙ্গে ঝগড়া
ও সবের মধ্যে আমিই দোষী

শুভম,তুই জানিস তিন নম্বর বাড়ানোর উপায়?
জানিস এই দৌড়ে ফার্স্ট হবার কৌশল?
সেই একশো মিটার দৌড়ে ফার্স্ট হওয়ার জন্য
সুজয় যেমন বিজনকে ল্যাং মেরে
ফেলে দিয়েছিল সেটাই রাস্তা কিনা!
শুভম,তোকে বলে দিচ্ছি,এবারও যদি ঋতব্রত আমাকে টপকে যায়,
বড়দিনে বাড়িতে নেমন্তন্ন করে কেক খাওয়াব
আর সেই কেকের মধ্যে মিশিয়ে দেব……………….

শুভম,আমি যে ঋতব্রতকে খুব ভালবাসি
ওর টিফিন ভাগ করে খাই আমি,
ঋতব্রত কি আমাকে কোনদিনও ক্ষমা করতে পারবে?
পারবি ঋতব্রত? পারবি!


------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


তুমি যখন আমাকে ভাবো
আমার কি কি ভাবো
চোখ বুজে আমাকে যখন দেখো
আমার কি কি তুমি দেখতে পাও-
আমার চোখ, আমার কম্পমান ভুরূ, মুখ, মুখমণ্ড, চুল এইসব...?
চোখ বুজে তুমি আমার ভিতরের
উথাল পাথাল আমাকে দেখতে কি পাও...
ভাবনায় বৃষ্টি ঝরে ?
অঝোর আষাঢ়ে বৃষ্টি ?
অর্ধ যুগ ঝরে ঝরে নদী হল যা ।

------------------------------------------------------

আমি অন্ধকার ঘরে থাকি
অন্ধকার আমাতে
চুপচাপ দাঁড়ায়ে ক্ষয়ে থাকে
জানালার শার্সি জোড়া
ফাঁকা মাঠ

নৈশব্দের নিচে ঘরবাড়ি সব
সরে আসতে পায়ে পায়ে
পেছনে কেউ নেই-
আকাশ অনেক কালোতে
দিকভ্রান্ত উড়োজাহাজে ডানা
টেনে দিল রেখা

সময়মাপা কাঁটার ঘরে
ঘড়ির কঙ্কাল
বিস্ত্ত অসমতা ঘিরে
উড়ে মসৃণ
পলক ফেলার অপেক্ষায়
ভাসমান আলোর মিছিল
বিঁধে লক্ষ্যহীন ইশারা
নির্মল বিষাদে

বাতি জ্বলে অন্ধকারে
অন্ধকার দাঁড়ায়ে থাকে ভীষণ আমাতে


--------------------------------------------------------------------------------------

তুমি ভালোবাসি বলতেই
আবার প্রথম জীবনের ভালবাসা আবিষ্ট করলো আমাকে
কেঁপে কেঁপে উঠলো আমার ঠোঁট মুখ চোখ
পুরনো জ্বরে আক্রান্ত হলাম বহুদিন পর ।

তুমি ভালোবাসি বলতেই
অদ্ভুত ভালোলাগা আচ্ছন্ন করলো আমাকে
কেঁপে কেঁপে উঠলো মধ্য দুপুরের অবেলা বাতাস
পুরনো শত্রুর বাড়ি একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে হাজির আমি ভুল করে ।

তুমি ভালোবাসি বলতেই
গুমোট ঘরে সুশীতল নিয়ন্ত্রিত করুণা বাতাস
দুজনের দূরত্ব কমবেনা জেনেও
সারা রাত মনের মাটিতে ফুটিয়েছি কাঠগোলাপ কাঁঠালচাঁপা যত ।

তুমি ভালোবাসি বলতেই
মেঘের আড়ালে লুকোচুরি চাঁদ আনাজের কলা
আকুলি বিকুলি করে ঘূর্ণির বায়ু
ভুল ভেবে মাঝি তবু ভিড়ায় নাও - প্রণয়ের ঘাটে ।

------------------------------------------------------------------------------------------


তোমাকে ভুলতে চেয়ে আরো বেশি ভালোবেসে ফেলি !
--মহাদেব সাহা--

তোমাকে ভুলতে চেয়ে আরো বেশি ভালোবেসে ফেলি
তোমাকে ছাড়াতে গিয়ে আরো বেশি গভীরে জড়াই,
যতোই তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই দূরে
ততোই তোমার হাতে বন্দি হয়ে পড়ি
তোমাকে এড়াতে গেলে এভাবেই
আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে যাই
এভাবেই সম্পূর্ণ আড়ষ্ট হয়ে পড়ি;
তোমাকে ছাড়াতে গেলে আরো ক্রমশ জড়িয়ে যাই
আমি
আমার কিছুই আর করার থাকে না
তুমি এভাবেই বেঁধে ফেলো যদি দূরে যেতে চাই
যদি ডুবে যেতে চাই তুমি দুহাতে জাগাও।
এমন সাধ্য কী আছে তোমার চোখের সামান্য
আড়াল হই,
দুই হাত দূরে যাই
যেখানেই যেতে চাই সেখানেই
বিছিয়ে রেখেছো ডালপালা,
তোমাকে কি অতিক্রম করা কখনও সম্ভব
তুমি সমুদ্রের চেয়েও সমুদ্র
আকাশের চেয়েও আকাশ তুমি আমার
ভেতরে জেগে আছো।
তোমাকে ভুলতে চেয়ে তাই আরো বেশি
ভালোবেসে ফেলি,
তোমাকে ঠেলতে গিয়ে দূরে আরো কাছে টেনে নেই
যতোই তোমার কাছ থেকে আমি দূরে যেতে চাই
ততো মিশে যাই নি:ম্বাসে প্রশ্বাসে,
ততোই তোমার আমি হয়ে পড়ি ছায়ার মতন;
কোনোদিকে যাওয়ার আর একটুও জায়গা থাকে না
তুমিই জড়িয়ে রাখো তোমার কাঁটায়।
তোমাকে ছাড়তে গিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে আরো জড়িয়েছি
তোমাকে ভুলতে গিয়ে আরো ভালোবেসেছি
তোমাকে।

-------------------------------------------------------------------------------------------------------


কষ্টের কস্তুরী -- তসলিমা নাসরিন

কিছু কিছু কষ্ট আছে
ক্ষতে কোন মলম লাগে না।
কারওর শুশ্রুষা নয়
গাঢ় মমতায় জেগে থাকা রাত নয়
হাওয়া পরিবর্তন, তা-ও নয়
সেরে যায়।

কিছু কষ্ট নিয়ত পোড়ায়
ক্ষুদ্র তুচ্ছ কিছু, ফুঁ মেরে উড়িয়ে
দেওয়ার মতো কিছু
কষ্টের ক্ষীণাঙ্গী শরীরেও
আগুনের আঁচ থাকে

সেইসব কষ্টগুলো
বর্শা বেঁধায় না
দুই চক্ষু অন্ধ করে না, কেবল
কোথায় কীসব যেন
পোড়াতে পোড়াতে করে নিভৃত অঙ্গার।

কিছু কিছু কষ্ট আছে
রাত পোহাবার আগে বাতাস মেলায়,
কিছু কষ্ট বাসা বাঁধে
ভালবেসে থেকে যায় পুরোটা জীবন।


----------------------------------------------------------------------------------------------------


কতটুকু ভালোবাসা দিলে,
ক তোড়া গোলাপ দিলে,
কতটুকু সময়, কতটা সমুদ্র দিলে,
কটি নির্ঘুম রাত দিলে, কফোটা জল দিলে চোখের –সব যেদিন ভীষণ আবেগে
শোনাচ্ছেলে আমাকে, বোঝাতে চাইছিলে আমাকে খুব ভালোবাসো, আমি বুঝে নিলাম
তুমি আমাকে এখন আর একটুও ভালোবাসোনা।
ভালোবাসা ফুরোলেই মানুষ হিসেব কষতে বসে, তুমিও বসেছো।
ভালোবাসা ততদিনই ভালোবাসা
যতদিন এটি অন্ধ থাকে, বধির থাকে,
যতদিন এটি বেহিসেবি থাকে।।


-------------------------------------------------------------------------------------------------------


ছল
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তোমারে পাছে সহজে বুঝি তাই কি এত লীলার ছল -
বাহিরে যবে হাসির ছটা ভিতরে থাকে আঁখির জল।
বুঝি গো আমি, বুঝি গো তব ছলনা -
যে কথা তুমি বলিতে চাও সে কথা তুমি বল না।।

তোমারে পাছে সহজে ধরি কিছুরই তব কিনারা নাই -
দশের দলে টানি গো পাছে কিরূপ তুমি, বিমুখ তাই।
বুঝি গো আমি, বুঝি গো তব ছলনা -
যে পথে তুমি চলিতে চাও সে পথে তুমি চল না।।

সবার চেয়ে অধিক চাহ, তাই কি তুমি ফিরিয়া যাও -
হেলার ভরে খেলার মতো ভিক্ষাঝুলি ভাসায়ে দাও?
বুঝেছি আমি, বুজেছি তব ছলনা -
সবার যাহে তৃপ্তি হল তোমার তাহে হল না।।


--------------------------------------------------------------------------------------------------------------

যদি তুমি ফিরে না আসো – শামসুর রাহমান

তুমি আমাকে ভুলে যাবে, আমি ভাবতেই পারি না।
আমাকে মন থেকে মুছে ফেলে
তুমি
আছো এই সংসারে, হাঁটছো বারান্দায়, মুখ দেখছো
আয়নায়, আঙুলে জড়াচ্ছো চুল, দেখছো
তোমার সিঁথি দিয়ে বেরিয়ে গেছে অন্তুহীন উদ্যানের পথ, দেখছো
তোমার হাতের তালুতে ঝলমল করছে রূপালি শহর,
আমাকে মন থেকে মুছে ফেলে
তুমি অস্তিত্বের ভূভাগে ফোটাচ্ছো ফুল
আমি ভাবতেই পারি না।

যখনই ভাবি, হঠাৎ কোনো একদিন তুমি
আমাকে ভুলে যেতে পারো,
যেমন ভুলে গেছো অনেকদিন আগে পড়া
কোনো উপন্যাস, তখন ভয়
কালো কামিজ প’রে হাজির হয় আমার সামনে,
পায়চারি করে ঘন ঘন মগজের মেঝেতে,
তখন
একটা বুনো ঘোড়া খুরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে আমাকে,
আর আমার আর্তনাদ ঘুরপাক খেতে খেতে
অবসন্ন হয়ে নিশ্চুপ এক সময়, যেমন
ভ্রষ্ট পথিকের চিৎকার হারিয়ে যায় বিশাল মরুভূমিতে।

বিদায় বেলায় সাঝটাঝ আমি মানি না
আমি চাই ফিরে এসো তুমি
স্মৃতি বিস্মৃতির প্রান্তর পেরিয়ে
শাড়ীর ঢেউ তুলে,সব অশ্লীল চিৎকার
সব বর্বর বচসা স্তব্ধ করে
ফিরে এসো তুমি, ফিরে এসো
স্বপ্নের মতো চিলেকোঠায়
মিশে যাও স্পন্দনে আমার।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


ওরা দুজন ফুটপাতে ঘুমায় ।
একটা ছেলে আর
একটা মেয়ে ।
ছেলেটার বয়স ছয় আর
মেয়েটার
এইতো সবে চার - ভাই বোন
ওরা !
ল্যামপোস্ট ঝরা সোডিয়াম
ল্যাম্পের
বিচিত্র আলোর
সাথে চাঁদের
আলো একাকার হয়ে সুখ
সুন্দর
আভা ফোটায় ওদের মুখে ।
ওরা চাঁদটাকে ঝলসানো রুট
তারা গুলোকে নিয়ে মন্ডা ম
স্বপ্ন দেখেনা,
আসলে ওরা কখনোই
স্বপ্ন দেখেনা । ছোট্ট
মেয়েটা একসময়
স্বপ্ন দেখত একটা লাল
টুকটুকে গাড়িতে চড়ার ,
একটা লাল
টুকটুকে ফ্রক পরার !
রোদভরা এক
লালচে বিকেলে ওদের
সামনে একটা লাল
টুকটুকে গাড়ি থেমেছিল,
রক্তের মত
লাল জামা পরা পুতুলের মত
ছোট্ট
একটা মেয়েও বের হয়েছিল
গাড়ি থেকে ! ছোট
মেয়েটা ছুঁয়ে দিয়েছিল
স্বপ্নের
গাড়িটাতে ,শুধু
আলতো করেই
ছুয়ে দিয়েছিলো,
গাড়ি থেকে এক
মোটাসোটা মহিলা এসে থা
মেরেছিল মেয়েটিকে যার
আঘাতে সে আছড়ে পড়েছিল
শক্ত
ফুটপাতে - তার
সাথে সাথে তার মন
থেকে ছিটকে গিয়েছিল
অনেক দিনের
পুরনো ভন্ড স্বপ্নটা ।
এরপর আর
ওরা স্বপ্ন
দেখেনি কোনদিন !! স্বপ্ন
ওদের জন্য নয় !
স্বপ্ন দেখা ওদের
সাজে না ।
ছোট ছোট দু'টি ভাইবোন
ওরা । ছোট
দুটি পাপহীন মুখ ওদের ।
রাস্তার
ধারে ছিমছাম দোকান
গুলোতে পরিপাটি করে সজা
খাবার ।
কখনো মাছি ভনভন
করে তার
ওপর, পিঁপড়ার মত
সারিবদ্ধ
ভাবে সেখানে ঢোকে মানুষ-
তৃপ্ত
হয়ে বেরিয়ে আসে ।
ওরা দুজন অতৃপ্ত
ছোখে চেয়ে থাকে সেদিকে
কিন্তু
কখনো ওরা যাই
না ওখানে । একদিন
খিদে পেয়েছিল ওদের ;
তাই
দোকানে খাবার চেয়েছিল
ওরা । খুব
ভদ্র ভাবেই চেয়েছিল ,
কিন্তু
দোকানিটা ওদের
ভদ্রতাকে হয়তো বুঝতে পার
থাপ্পড় দিয়ে দুজনকে বের
করে দিয়ে ছিলো দোকান
থেকে ।
খাবার
না পেয়ে দুজনে একদিন
চুরিও
করেছিল । তেমন কিছু না,
দুটো অবাধ্য
ক্ষুদ্র পেটকে শান্ত করার
মত ছোট ছোট
দুটি রুটি । তাতেই
দোকানী আর
আশেপাশের লোকজন ওদের
খুব
পিটিয়েছিলো । রাস্তার
এককোনের
গুদামঘরের পাশে সেই
রাতটি ওদের
কেটেছিল
পুরো অস্তিত্বে মায়াময়
যন্ত্রনা নিয়ে !
সত্যিকারের
যন্ত্রনা !! এরপর আর
ওরা কখনো চাইনি কারো কা
কোনদিন চুরিও করেনি ।
চাওয়া আর
চুরি করা দুটোকেই
ওরা এখন অপরাধ
মনে করে । অপরাধই
যদি না হবে তাহলে ওরা ম
খেলো কেন ?
একটা ছেলে আর
একটা মেয়ে ।
মিষ্টি দু'টি ভাই বোন
ওরা !
হাতে ত্রিশুল,
পায়ে ইয়া বড়
ফাটা গামবুট আর
পরনে হাবিজাবি কাপড়ের
বস্তার মত
ছেঁড়াখোড়া জামা পরে ট্রা
কন্ট্রোল করে মনা ।
তথাকথিত
স্বাভাবিক
মানুষেরা তাকে মনা পাগল
ডাকে, ভাই বোন
দু'টি ডাকে মনাকা বলে ।
ছোট
বোনটি একদিন ওদের
মনাকাকাকে জিঞ্জেস
করছিলো "আইচ্চা মনাকা,
হগ্গোলেরই ত
মা-বাপ থাকে...তাইনা ?"
একটু
হেসে মনা পাগল
বলেছিলো " হ মা,
থাকতো না ক্যান ? মা বাপ
হগ্গোলরই
থাকতো, হ্যারা যদি না রই
পুলাপান
আইবো কৈত্তে !!"
অনুযোগের সুরে ছোট্ট
মেয়েটি বলেছিল
"তাইলে আমাগোর নাই
ক্যান ?"
চমকে উঠে বিষন্ন
চোখে একরাশ
হতাশা নিয়ে তাকানো ছাড়
জবাব
দিতে পারেনি মনা পাগল

মেয়েটিকে একথাটাও
বোঝাতে পারেনি সবার
সবকিছু
থাকেনা, সবার সব কিছু
থাকতে নেই !
মিষ্টি দুটি ভাইবোন
ওরা ।
সাহসী একটা সম্পর্ক ওদের

যে সাহসটুকু ওদের সাহস
যোগায়
বেঁচে থাকার , কষ্ট সহ্য
করার ।
পৃথিবীর সব অবাধ্য
এলোমেলো দুঃখ
গুলোকে নিজেদের সব
থেকে আপন
ভুবনে সাজিয়ে ওরা এভাবে
বেঁচে ছিল,
আছে এবং প্রতিনিয়ত
বেঁচে থাকবে, বারেবারে -
প্রতিদিন !
তীব্র ছায়ায়
ডুবে থাকা ছোট
দুটি ভাললাগা ওরা !
ল্যামপোস্ট
ঝরা সোডিয়াম ল্যাম্পের
বিচিত্র
আলোর সাথে চাঁদের
আলো একাকার
হয়ে সুখ সুন্দর আভা ফোটায়
ওদের মুখে ।
ওর দুজন ফুটপাতে ঘুমায় !!


------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------



Comments

Popular posts from this blog

**কষ্টকে ভালোবেসে আমি কবি হবো**

আমাদের দুজনার পৃথিবী দুটো শুরু থেকে আলাদা, তোর পুতুল খেলার সংসার, রংচঙে সাজানো গোছানো, তোর চুলের ক্লিপ, ধোয়া তোয়ালে,পোশাক রং মেলানো, আমিও সেই জগতের পভোলা এক পথিক শুধু, কখনও ভ্রমর হয়ে ফুলের থেকে চুরি করে একটু মধু, বাদবাকি খোঁচা-খোঁচা দাড়ি-গোঁফে,আমি কালো সাদা, আমাদের দুজনার পৃথিবী দুটো শুরু থেকেই আলাদা । আমার ভালো লাগে মেঘলা আকাশ, এক-পশলা ইলশেগুঁড়ি, রাতজাগা পাখির ডাক আর পুর্নিমাতে চাঁদেরবুড়ি, সেই জগতে কোনোখানেও ভুল করেও আসবিনা তুই, অথচ সবের পরেও দুইজনেতে একই খাটেই শুই, একই ঘরে দুজনার দুই পৃথিবী বাঁচবে আধা-আধা, আমাদের দুজনার পৃথিবী দুটো শুরু থেকেই আলাদা । তোর সাথে রং মিলিয়ে আমি, চাইলে হয়ত পাল্টাতেও পারি, তোকেও হয়ত ভুল বুজিয়ে, আমার জগতে ডেকে নিতে পারি, কিন্তু সেতো নিছক জীবনের সাথে সমঝোতাই হবে, দুই পৃথিবীর দুটো জীবন তখন কি আর জীবন-খুঁজে পাবে ? ----------------------------------------------------------------------------- সমুদ্র হোক বা পাহাড়, নদী হোক বা পর্বত, দৃষ্টির আরাম-খুজতে আমরা সবাই ছুটে যেতে চাই । আর,শুধু কি চোখের আরাম ? সাথে কাজের বিরাম, মুখের আরাম,সঙ্গে পেটে একটু রঙিন জল পড়লে, প...

*** শ্রীজাত **

ভাঙছে ঠুনকো আড্ডা সাতটা লাল চা, বিস্কুট দাম মেটাচ্ছে খুচরো। অল্প-অল্প বৃষ্টি একলা হাঁটছি, আস্তে স্বপ্ন বলতে চাকরি অস্ত্র বলতে ধান্দা সত্যিমিথ্যে বন্ধু পেট গোলাচ্ছে, যাক গে ফিরতে ফিরতে রাত্তির ভাত সামান্য ঠান্ডা খাচ্ছি, গিলছি, ভাবছি ছোট্টো একটা জানলার পাল্লা ভিজছে হয়তো, নীলচে শান্ত পর্দা একটু-একটু দুলছে, চুল গড়াচ্ছে বিছনায়, পাতলা, স্বচ্ছ নাইটি… -------------------------------------------------------------------------- সহজভাবে পড়তে আসি দরাজ পাঁচিল, রোদের চিকন হালকা সেসব শব্দ, তবু তোমরা বল দেওয়াল লিখন সহজভাবে দেখতে আসি টুকরো কাপড়, রঙের মজা হাওয়ায় কেমন দিব্যি ওড়ে, তোমরা বল জয়ধ্বজা সহজভাবে শুনতে আসি ভালই লাগে আমারও গান সুরের যত রকমসকম - তোমরা বল দাবি, স্লোগান সহজভাবে হাঁটতে আসি আলগা পায়ে আলতো হোঁচট পথের ধারে খোলামকুচি তোমরা বল বিরুদ্ধজোট এসব যদি সহজ না হয় সহজ তবে বলব কাকে? তার চাইতে তোমরা বরং জটিল করে দাও আমাকে। ------------------------------------------------------------------------- সারারাত ঝড়ের পরে তোমার কাছে আসা ভেবেছি শিখিয়ে দেব সকালবেলার ভাষা সকালের গাছগুলো সব নিথর, জড়োসড়ো অভি...

***ভালোবাসা পুঁজি করে নেমে পড় জীবনযুদ্ধে ***

একটা ব্যাকডেটেড মেয়ে খুজে নাও । যে ভালোবাসি বলার আগে তিনবার হোচট খাবে । মাঝে মাঝে হাল্কা শাসনে যে মনে করিয়ে দিবে জীবনের কথা । এত্তোগুলা ভালোবাসা পুঁজি করে নেমে পড় জীবনযুদ্ধে । বাসের ভিড়েপরম যত্নে শরীর দিয়ে আড়াল কর তার খোপার উদ্দেশ্যে কিনে নেয়া রক্তগোলাপটাকে। একটা ভালো ছবি তুলে বেড়ে যাক তোমাদের ভালোবাসা । শীতার্ত সন্ধ্যায় চায়ের কাপ টুকু ভাগাভাগি করে বুঝে নাও তোমাদের ভাল থাকার অধিকার। কপালে নেমে আসা ওর দুএকটা চুলে আঙ্গুল বোলাও অবুঝ আহ্লাদে । কোন এক শীতার্ত দুপুরে কোনও পার্কে ডুব দাও তার ঠোঁটের আটলান্টিকে। শুধু একটা ব্যাকডেটেড মেয়ে খুজে নাও ... ভালোবাসার থার্মোমিটার ফাটিয়ে দাও!!! ---------------------------------------------------------------------- আমার শব্দ চয়নে আভিজাত্য নেই; প্রতিদিনকার চাল,ডাল, লবণ পিয়াজের মতো নিত্যনৈমিত্তিক খাবারে মতো সাধারণ শব্দে আমার কাব্য যেমন সাধারণ আমার পরিধেয়। তোমাকে ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় বিলাসিতা! যদি আমাকে ভালবেসে পাশে থাকো তবে আমি চিরকাল সাধারণই থাকবো যা আমার আমিত্বের প্রকাশ। আমি সব হারাতে প্রস্তুত; কিন্তু আমার...